করোনাকাল বাড়ছে সাইবার অপরাধ

0
21

বেশি প্রতারণা হচ্ছে বিকাশভিত্তিক
নিরাপদ ডিজিটাল দেশ গড়ার স্বপ্ন ব্যাহত হবে

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি সেবা ছাড়া প্রায় সব বন্ধ রয়েছে। ঘরে থাকছেন অধিকাংশ মানুষ। এমন বাস্তবতায় বেশির ভাগের সময় কাটছে ভার্চুয়াল জগৎকে ঘিরে। বসে নেই অপরাধজগতের কুশীলবরা। লকডাউনের মধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার ও টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করছে তারা। ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস ও লিংক শেয়ারের পাশাপাশি তারা করোনা নিয়ে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়েও প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে বিকাশভিত্তিক প্রতারণা হচ্ছে অনেক বেশি। এসব বন্ধ করতে না পারলে নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে ডিএমপির সিটিটিসির সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম ডিভিশনের মো. নাজমুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, সাইবার অপরাধীদের বিষয়ে তারা সচেতন রয়েছেন। মোবাইল ব্যাংকিং, হ্যাকিং, মানুষকে নিয়ে অফসিন কমেন্ট বা ডিসইনফরমেশন ও করোনা গুজব ৪টি বিষয়ে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া অভিযোগ পেলে দ্রুত তদন্ত করে নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো দেশের অধিকাংশ জনগণ সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকলেও থেমে নেই ভার্চুয়াল জগৎ। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও পাঠদান চলছে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাড়িতে থেকেই চলমান রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের আদান-প্রদান হচ্ছে ই-মেইলে। অনলাইনভিত্তিক কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের বাসায় থেকেই কাজ চালিয়ে নিতে বলছে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চলছে জরুরি ব্যাংকিং কার্যক্রম। দৈনন্দিন কেনাকাটা চলছে অনলাইন শপের মাধ্যমে। আর অধিকাংশ মানুষ সময় কাটাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই বাস্তবতায় সাইবার অপরাধীদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু এখন ছোট-বড় ই-কমার্স সাইট, অনলাইন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি। ম্যালওয়্যার, ফিশিং ও বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণা নানা ফাঁদ পাতছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৯ এপ্রিল এক সিনিয়র সাংবাদিকের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে প্রতারক চক্র। পরে তার অ্যাকাউন্ট থেকে বার্তা পাঠিয়ে আরো কয়েক সাংবাদিকের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়। তার হ্যাক হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে ‘হ্যালো, আই অ্যাম সরি, আই সেন্ড ইউ অ্যা ৬ ডিজিট কোড এসএমএস বাই মিসটেক। ক্যান ইউ পাস ইট টু মি প্লিজ? ইট ইজ আর্জেন্ট? এমন বার্তা পরিচিতদের পাঠানো হচ্ছে। মেসেজ হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তির মোবাইলে ৬ ডিজিটের একটি কোড ও লিংক চলে যাচ্ছে। বিষয়টি তার জন্য বিব্রতকর বলেও জানান তিনি। এছাড়া ফেসবুকে ‘হাতের কাজ’ নামে একটি পেইজে গত মঙ্গলবার দুটি থ্রিপিসের অর্ডার দিয়ে প্রতারিত হন এক নারী। ওই নারী জানান, পেইজটির নিয়ন্ত্রক নাইমা তার ফেইসবুক আইডি থেকে ০১৮২৭৬৮৯০১০ বিকাশ অ্যাকাউন্ট নম্বরে ৭০০ টাকা পাঠাতে বলেন। দুপুর ১টার মধ্যে টাকা পাঠালে ৪৫ মিনিটের মধ্যে পণ্য বাসায় পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু বিকাল গড়িয়ে গেলেও থ্রিপিস না পেয়ে তিনি ‘হাতের কাজ’ পেইজে ঢুকতে গিয়ে দেখেন তাকে ব্লক করা হয়েছে। যে নম্বরে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছেন সেই নম্বরেও কল যাচ্ছে না। সর্বশেষ গতকালও এক সাংবাদিককে ০১৮৭২৬০৭৬২০- এই নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে বলা হয়, বিকাশ অফিস থেকে বলছি। আপনার আইডি দুদিন আগে বন্ধ হয়েছে। পাসওয়ার্ড বলতে হবে। তাহলে তার আইডি সচল করে দেয়া হবে। বিষয়টি আচ করতে পেরে কোনো তথ্য না দিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি। পরে বিক্যাশ কাস্টমার কেয়ারেও যোগাযোগ করলে জানতে পারেন তার অ্যাকাউন্ট সচল রয়েছে। পরে ওই নম্বরে ফোন করলে বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও বিইউবিটির সিইসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর জোহা ভোরের কাগজকে বলেন, ম্যালওয়্যার, ফিশিং ও বিকাশ প্রতারণাসহ নানা মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে সাইবার অপরাধীরা। ম্যালওয়্যার ও ফিশিংয়ের মাধ্যমে মেইলে বা ম্যাসেঞ্জারে নানা লোভনীয় বিজ্ঞাপন বা খবরের আকারে লিংক পাঠানো হয়। না বুঝে বা লোভের বশবর্তী হয়ে ওইসব লিংকে ক্লিক করেন অধিকাংশ। আর এক ক্লিকেই আপনি হয়ে যান সাইবার অপরাধীদের নির্মম শিকার। অ্যাকাউন্ট হ্যাক করাসহ ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয়া ও টাকা চলে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে আপনার সব প্রকার আইডি ও অ্যাকাউন্টের জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন ও কিছুদিন পরপর তা পরিবর্তন করুন। অপরিচিত অ্যাড্রেস থেকে আসা ই-মেইল খোলা থেকে বিরত থাকুন। আপনার ই-মেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের (ফেসবুক, টুইটার) নিরাপত্তা সেটিংস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও আপডেট করুন। সব জরুরি ডকুমেন্টের নিয়মিত ব্যাকআপ রাখুন ও ব্যাকআপ লোকেশনেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। হোম নেটওয়ার্ক বা বাসার ওয়াইফাই সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর পাসওয়ার্ড নিয়মিত পরিবর্তন এবং ইউজার লগ পর্যবেক্ষণ করুন। আপনার ডিভাইসগুলোতে আপডেটেড অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করুন।

তিনি আরো বলেন, আসলে আমাদের দেশে এখনো সাইবার অপরাধ রোধে দক্ষ জনবল তৈরি হয়নি। ভালো সাইবার ফরেনসিক ল্যাবও নেই। এমন অবস্থায় আমাদের এ বিষয়ে আরো এক্সপার্টিস তৈরি করতে হবে। নইলে নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তা বাধাগ্রস্ত হবে। বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম ভোরের কাগজকে বলেন, পুরোনো গ্রাহকদের পাশাপাশি অনেক নতুন গ্রাহক জরুরি এই সময়ে বিকাশ ব্যবহার করা শুরু করেছেন। তবে কিছু অসাধু ব্যক্তি এর মধ্যেও গ্রাহকদের নানা প্রতারণার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রতারণা রোধে দেশের সর্বত্র গ্রাহকদের সচেতন করতে বিকাশ কর্তৃপক্ষ সব সময়ই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আসছে। নিয়মিত বিজ্ঞাপন, সকল মূলধারার মিডিয়া ও সোশাল মিডিয়ায় সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে বিকাশ তার গ্রাহকদের সচেতন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এ ব্যাপারে আরো সতর্ক থাকার জন্য গ্রাহকরা নিম্নোক্ত উপায়গুলো মেনে চলতে পারেন।

এ বিষয়ে র‌্যাব মিডিয়া এন্ড লিগ্যাল উইংয়ের পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, সাইবার আপরাধ বিষয়ে আমরা সজাগ রয়েছি। বিশেষ করে করোনাকেন্দ্রিক গুজবের বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর অপরাধে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। র‌্যাব সাইবার অপরাধ রুখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY