লকডাউনে ফিরছে সুখস্মৃতি, দৃঢ় হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন

0
29

আপনি কি কখনো ভেবেছিলেন যে এভাবে আমাদের একদিন বাড়ির ভেতরে থাকতে বাধ্য হতে হবে? এরই মধ্যে ঘরবন্দি অবস্থার কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। আমরা সবাই স্বাভাবিক জীবনে যেসব কাজ হরহামেশা করি, যেমন- বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, হাত মেলানো, আলিঙ্গন করা, প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে খাবার খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া এমন অনেক স্বাভাবিক কাজই এখন করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ঘরবন্দি অবস্থারও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দি অবস্থা আমাদের ব্যাপক ইতিবাচক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বয়ে এনেছে। পরিবারের মানুষের সঙ্গে আমাদের এতটা কাছাকাছি এনেছে যা ইতোপূর্বে কখনো ঘটেনি। লকডাউনে এমন কতগুলো ঘটনা ঘটছে যাতে করে মানুষের অতিত সুখস্মৃতি ফিরে আসছে, পরিবারগুলোকে আরও কাছে আনছে। চলুন এমন কতগুলো বিষয় জেনে নিই

১. সবাই একসঙ্গে খাবার খাওয়া

পুরানো ঢাকার ব্যবসায়ি বোরহানউদ্দিন। এখন স্ত্রীর সঙ্গে গল্প গুজব করে ও ব্যবসায়ের খোঁজ খবর নিয়ে সময় কাটে তার। ব্যবসা দেখাশোনা করেন তার তিন ছেলে। ঢাকায় চার তলা বাড়িতেই একসঙ্গে বাস করেন তারা। তিন ফ্লোরে তিন ছেলের সংসার ও এক ফ্লোরে স্ত্রীকে নিয়ে সময় কাটে বোরহানউদ্দিনের। সবাই একসঙ্গে থাকলেও গৃহকর্মীরা খাবার দাবার ডাইনিংয়ে রাখতেন এবং যার যার ইচ্ছানুযায়ী খেয়ে নিতেন। অনেক সময় কারো সঙ্গে কারো দেখাও হতো না।

কিন্তু করোনাভাইরাস রুখতে ঘরবন্দি সময় যেন আরও আনন্দের উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে বোরহানউদ্দিনের। কারণ ভাইরাসের সংক্রমণ যাতে না হয় এজন্য কাজের মহিলাদের বাসায় আসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন বাড়ির তিন বউ একসঙ্গে ঘরের সব কাজ করছেন আর ছেলেরাও ব্যবসার জন্য বাইরে যাচ্ছে না। একসঙ্গে খাচ্ছেন, টিভি দেখছেন। বোরহানউদ্দিন সাহেবের যেন মনে হচ্ছে কল্পনার জগতে আছেন তিনি।

২. খাবার টেবিলে কথোপকথন

একসঙ্গে পরিবারের সবাই খাবার খাওয়ার কারণে অনেক গল্প-গুজব হয়। হাসি ঠাট্টাও বাদ যায় না। ভাইরাস পরিস্থিতিসহ জাতীয় আন্তর্জাতিক ব্যবসা সবই থাকে খাবার টেবিলের গল্পে। সবাই সবার মতামত দেয় কখনো কিছুটা মিষ্টি তর্কাতর্কিও হয়। পরিবারে আগে যেখানে কারো সঙ্গে তেমন দেখাও হতো না সেই পরিস্থিতির চেয়ে এখন আশাতীত উন্নতি ঘটছে পারিবারিক বন্ধনে।

৩. বাসার কাজ করা সবার দায়িত্ব

ঘরের কাজ নারীরা করবে আর বাইরের কাজ পুরুষেরা। এই চিরাচরিত ধ্যান ধারণা বদলে দিয়েছে লকডাউন। কারণ বেশিরভাগ বাড়িতেই করোনাভাইরাসে ঘরবন্দি থাকার সময়ে গৃহকর্মীকে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। এতে করে ঘরের সবাই মিলেই সারছেন বেশিরভাগ কাজ। দায়িত্ব নিয়ে সবাই বাসার কাজ করাতে পারিবারিক বন্ধন আগের চেয়ে অনেকগুণ বাড়ছে।

৪. কথা ও হাসি হচ্ছে বেশি, বিরক্ত কম

সবাই বাড়িতে একসঙ্গে থাকায় গল্প-হাসি-ঠাট্টা অনেক বেড়েছে। টিভি রুমে গল্প, খেতে গেলে গল্প, কাজ করতে গেলে গল্প, গল্পের যেন কোনো শেষ নেই। বেশিরভাগ পরিবারের সদস্যদেরই সময় কাটছে নিজেদের মধ্যে কথা বলে।

৫. জাঙ্ক ফুডের বদলে ঘরের খাবার

সাধারণ সময়ে কেউ বেশি কেউ কম জাঙ্গ ফুড গ্রহণ করতেন অনেকে। তবে এই ঘরবন্দি অবস্থায় বেশিরভাগ সময়ই খেতে হচ্ছে ঘরে তৈরি খাবার। যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী ও এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রাও একেবারে কম।

৬. টানা টিভি দেখাতে একঘেয়েমি

অনেকে এখনই ঘর থেকে বের হতে চাইছেন। কারণ ঘরবন্দি অবস্থায় একাধারে টিভি দেখতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত। এই কারণে টিভি দেখা বাদ দিয়ে অনিচ্ছায় হলেও ঘরের দিকে নজর দিচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন।

৭. ঘরে ফিরছে ক্লাসিক খেলাগুলো

ঘরের পুরুষ-মহিলা সব সদস্য মিলে একসঙ্গে লুডু খেলা হবে। সাধারণ সময়ে অনেক পরিবারের কাছে এটা ছিল স্বপ্নের মতো। কারণ পুরুষেরা ক্লাবে তাস খেলায় মগ্ন থাকতেন আর নারীরা সংসার সামলাতে ব্যস্ত। তবে ঘরবন্দি অবস্থা সেই স্বপ্নকে বাস্তব করেছে। এই সময়ে ঘরে আবার ফিরে এসেছে লুডু-দাবা-ক্যারামের মতো ক্লাসিক খেলাগুলো।

৮. টেলিভিশনেও ফিরেছে ক্লাসিক শো-নাটক

ঘরে ক্লাসিক খেলাগুলো ফেরার পাশাপাশি টেলিভিশনেও ফিরেছে কয়েক দশক আগে ব্যাপক জনপ্রিয় নাটকও।

আশির দশকের শেষের দিকে বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’। সেসময় নাটকটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটি দর্শকদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠে। এ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। অন্যদিকে মুনা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুবর্ণা মুস্তফা। জনপ্রিয় এই নাটকটি আবারো প্রচার করছে বাংলাদেশ টেলিভিশন। প্রচার হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের আরেক জনপ্রিয় নাটক বহুব্রীহিও।

রাত ৮টার বিটিভির সংবাদের পর ‘কোথাও কেউ নেই’ এবং এটি শেষ হওয়ার পরপরই ‘বহুব্রীহি’র প্রচারিত হচ্ছে।

৯.পরিবারের প্রতি আরও সহানুভূতিশীলতা আসছে

এই ঘরবন্দি সময়ে আপনি পরিবারের সদস্যদের আরও ভালোভাবে বুঝার সুযোগ পাচ্ছেন। আপনি তাদের ব্যাপারে অন্যরকম ভাবছেন। অনেক সময় বিভিন্ন ঘটনার দিকে নজর দিচ্ছেন। এই জিনিসগুলো আপনাকে পরিবারের সদস্যদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল করে তুলছে।

১০. একসঙ্গে রান্নার সহজ আনন্দ ফিরে এসেছে

স্বামী সকাল হলেই বের হন অফিস বা ব্যবসার কাজে। ফেরেন সন্ধ্যা হবার পর বা রাতে। সারাদিন স্ত্রীর নানা কাজ নিয়ে তিনি ভাবেন কিন্তু অনেক সময় কিছুই করার থাকে না। এসব স্বামীদেরকে যেন সুযোগ এনে দিয়েছে করোনাভাইরাস। ঘরে স্ত্রী বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের একসঙ্গে নিয়ে রান্না করার সহজ আনন্দটাই ধরা দিয়েছে।

১১. পার্টি এখন ক্লাবে নয় বাড়িতে

একসঙ্গে পরিবারের ছোট-বড় সকলেই। ইচ্ছা করলেও কেউ বাইরে যেতে পারছে না। এমন অবস্থায় পরিবারের বড় সদস্যরা যেখানে পার্টি করতে বিভিন্ন ক্লাবমুখী ছিলেন তারা এখন বাড়িতেই পার্টি এনজয় করছেন। একসঙ্গে খাবার, বা বিশেষ কোনো আয়োজনে চলছে এই ঘরোয়া পার্টি।

১২. ধূমপানমুক্ত হওয়ার সুযোগ এসেছে

অনেকে প্রকাশ্যে ধূমপান করেন। তবে বেশিরভাগ লোক এখনো রয়েছেন যারা পরিবারের সদস্যদের সামনে, বাবা-মা বা সন্তানের সামনে ধূমপান করেন না। ঘরবন্দি অবস্থায় তাদের নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়তো কষ্ট হচ্ছে। তবে এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যদি কেউ ইচ্ছা করেন তাহলে এই সুযোগ ধূমপান ছেড়ে দিতে পারেন। এই দীর্ঘ সময়ে ধূমপান না করার অভ্যাসটাই তাকে ধূমপানমুক্ত করতে সর্বোচ্চ সহযোগীতা করবে।

১৩. পোষ্যরা অনেক বেশি আদর পাচ্ছে

অনেকেই ঘরে বা বাড়িতে বিভিন্ন প্রাণী পুষতে পছন্দ করেন। কুকুর-বেড়াল, পাখি, মাছসহ অনেক প্রাণী রয়েছে যেগুলো অনেকে পুষে থাকেন। সাধারণ সময়ে তারা আপনার খুব বেশি আদর পেত না। কারণ আপনি নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এখন তারা আপনার আদর অনেক বেশি সময় ধরে পাচ্ছে।

১৪. প্রকৃতিকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে

যারা শহরে রয়েছেন তারা হয়তো বাসায় বাইরে যেতে পারছেন না। তবে বারান্দায় বসে বা বাসায় থাকা গাছের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে প্রকৃতির আরও কাছে যাচ্ছেন। আর যারা গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন তারা অনায়াসেই প্রকৃতির খুব কাছে রয়েছেন। আর করোনায় বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ ঘরবন্দি থাকার কারণে বাতাসে শুদ্ধতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক।

১৫. মোবাইলে কথা বলা বেড়েছে

ঘরবন্দি থাকায় অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো কথা বলা। কয়েক দশক আগেও এক মিনিট কথা বলার জন্য ল্যান্ডলাইনে কত চেষ্টাই না করা লাগতো। কিন্তু এখন হাতের কাছেই মোবাইল। এতে মনে পড়ছে অতিতস্মৃতি ও কথা বলার আনন্দের কথা।

১৬. ব্যায়ামের পর্যাপ্ত সময়

আগে অনেকে ব্যায়াম করার সময় পেতেন না আবার কেউ অলসতার অজুহাতে সেটি করতেন না। তবে ঘরবন্দি অবস্থায় অনেকে ব্যায়াম করছেন নিয়মিত। শরীরের দিকেও বাড়তি নজর দেয়ার সময় এসেছে।

১৭. শখ পালনে পর্যাপ্ত সময়

অনেকের ঘরের বিভিন্ন কাজে অনেক শখ থাকলেও সময়ের অভাবে বা ব্যস্ততার কারণে করা হয়ে ওঠে না। তবে এখন তেমন ভাবনার সময় নয়। যাদের রান্নার শখ বা ঘরেই কিছু করার শখ তারা এরই মধ্যে তাদের শখ পালনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আপনি যদি এখনো না করেন তবে আজই চেষ্টা করুন।

১৮. পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক

অনেক সময় হাতে। এই সুযোগে অনেকে স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। যাদের সঙ্গে অনেক দিন কোনো যোগাযোগ নেই তারাও এখন একে অপরের সঙ্গে অনলাইনে বা মোবাইলে অনেক কথা বলছেন। এতে ফিরছে অতিতের সুখস্মৃতি আবার লকডাউনও কাটছে আনন্দে।

১৯. নিজেকে চেনার সময়

দীর্ঘ সময় ঘরবন্দি। বেশিরভাগ সময় বিভিন্নভাবে কাটলেও নিজের জন্যও এখন সময়ের অভাব নেই। নিজের ব্যাপারে ভাবছেন, নিজেকে চিনছেন। এতদিন বিভিন্ন ব্যস্ততায় নিজেকে দেখাই হয়নি। সেই কাজটি এখন নিরবিচ্ছিন্নভাবে করছেন অনেকে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY