‘যে হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছি, সেই হাতে প্রাইভেট কার চালাব’

0
50

রাহেলা আক্তার। অচেনা, যাদুর এই শহরে একাকী এক যোদ্ধা। যুদ্ধটা তার জীবনের সঙ্গে, জীবিকার প্রয়োজনে। তিনি যখন টুং টাং বেল বাজিয়ে রিকশার প্যাডেলে পা রাখেন, তখন শহরটাই বুঝি থমকে দাঁড়ায়। শত-সহস্র পথচারীর অবাক দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে রাহেলার গন্তব্যপথে। হুস্‌ করে রাহেলাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় যে দ্রুতযান, সেগুলোর চালকের চোখেও খেলা করে বিস্ময়। যেতে যেতে তারাও বারকয়েক ফিরে তাকান রাহেলার দিকে। এ কি চোখের ভুল! না, তা নয়। পুরুষ রিকশাওয়ালারা জানেন রাজপথে রাহেলাকেও তাদের সমান ঘাম ঝরাতে হয়। আর জানেন রাহেলা নিজে। যে কারণে বিস্মিত চোখগুলোর প্রতি তার কোনো অনুভূতি কাজ করে না। দিনমান মনে একটাই চিন্তা- রিকশা চালিয়ে জমার টাকা তুলতে হবে। সন্ধ্যায় ফিরতে হবে ঘরে। সেখানে তার অপেক্ষায় রয়েছে ছোট্ট দুটি সন্তান।

রাহেলাও একসময় অপেক্ষায় দিন গুনতেন- স্বামী থাকবে, সংসার হবে, দূর হবে কষ্ট। রাহেলার অপেক্ষা ফুরিয়েছিল। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সংসারে তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের খুব আদরের। যে কারণে বিয়ে হয়েছিল কম বয়সে, বাড়ির কাছেই। তখন তিনি সবে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। বিয়ের পর আর পড়া হলো না। হওয়ার কথাও নয়। কারণ স্বামীর সংসারে তখন নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এই অভাবই তাকে সংসার থেকে দূরে ঠেলে দিলো। হলো না সংসার!

বিবাহিত জীবনের চার বছরের মধ্যেই রাহেলার রঙিন স্বপ্নগুলো একে একে বিবর্ণ হয়ে গেল। স্বামী (তার নাম রাহেলা এখন আর মুখে আনতে রাজি নন) ভরণ-পোষণ না দেয়ায় দুই সন্তানকে নিয়ে রাহেলা ঢাকার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন। যে বাবা সন্তানের জন্য দু’মুঠো আহার জোগাতে পারেন না, যে স্বামীর স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ববোধ নেই, তার সংসারে বোঝা হয়ে থাকতে চাননি তিনি। চাইলে শরীয়তপুর শহরে বাবার বাড়িতেও তিনি উঠতে পারতেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা মন বাদ সেধেছে।

‘প্রথমে লজ্জা লাগত। এ কারণে মাস্ক পরে নেই। সবাই বলে- মেয়ে মানুষ হয়ে এসব কেন করি? কিন্তু ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে কোনো কষ্টকেই আর কষ্ট মনে হয় না। কষ্ট শুধু একটাই- যে হাতে ছেলেমেয়েদের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছি।’  

রাহেলা চেয়েছেন নিজেই কিছু করবেন। ঢাকা এসে বিভিন্নভাবে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। বেতের ব্যবসা, গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি, মুটের কাজও করেছেন। কিন্তু নানা কারণে সেগুলো ছাড়তে হয়েছে। আলো ঝলমল যাদুর এই শহরের অন্ধকার ততদিনে তিনি চিনে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত রিকশা চালক হিসেবেই পার করে দিয়েছেন জীবনের প্রায় চারটি বছর।

রাহেলা বলেন, ‘মেয়ে হয়ে রিকশা চালানো যে কত কঠিন, তা একমাত্র যিনি চালান তিনিই বুঝবেন। অন্যদের এই কষ্ট বুঝানো যাবে না; তারা অনুভবও করতে পারবেন না।’

রিকশা পেলেন কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে রাহেলা প্রথমে মুচকি হাসেন। হাসির আড়ালে দীর্ঘশ্বাস চাপা থাকে না। তিনি বলেন, ‘গ্যারেজ থেকে গ্যারেজে ঘুরেছি। কেউ রিকশা দিতে চায়নি। সবারই এককথা- এই শহরে আমি মেয়েমানুষ হয়ে কীভাবে রিকশা চালাব। কিন্তু আমি শুধু ভেবেছি জীবন তো আমাকেই বয়ে নিয়ে যেতে হবে। অনুরোধ করেছি, বুঝিয়ে বলেছি- চালাতে পারব। এক্সিডেন্ট হবে না। শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদপুর বেঁড়িবাধ এলাকায় লিটনের গ্যারেজ থেকে একটা রিকশা পাই। এখন সেই রিকশা চালাচ্ছি। প্রতিদিন একশ টাকা জমা দিতে হয়।’
প্রতিদিন সকালে এক টুকরো পাউরুটি অথবা বিস্কুট মুখে দিয়েই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রাহেলা। দুপুরে খান চা আর পাউরুটি। ভাত খান সারাদিন পরিশ্রমের পর রাতে বাসায় ফিরে; দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। রাহেলা যখন কথাগুলো বলছিলেন দু’চোখের কোণে জল টলমল করছিল। সামলে নিয়ে বলেন, ‘প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত। এ কারণে মাস্ক পরে নেই। সবাই বলে- মেয়ে মানুষ হয়ে এসব কেন করি? পরিশ্রম বেশি হয়। কিন্তু ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো কষ্টকেই আর কষ্ট মনে হয় না। কষ্ট শুধু একটাই- যে হাতে ছেলেমেয়েদের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেই হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছি।’

এবার আর চোখের জল বাধ মানে না। গড়িয়ে পড়ে নীরবে। আমি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার। রাহেলার আক্ষেপ ফুরায় না। তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল ভালো স্বামী পাব, সুখের সংসার হবে, কিন্তু এমন স্বামী পেলাম যে, ঢাকা এসে রিকশা চালাতে হচ্ছে। সমাজে কত কথা শুনতে হয়! বুকের মধ্যে লাগে! কিন্তু কাউকে বুঝতে দেই না। এখন একটাই স্বপ্ন- যত কষ্টই হোক, ওদের লেখাপড়া করাব। যে হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছি, সেই হাতে নিজের প্রাইভেট কার চালাব।’

সম্প্রতি রাহেলাকে নিয়ে একটি শর্ট ফিল্ম নির্মাণ করেছেন নভেরা হাসান নিক্কণ। তিনি রাহেলার দুঃখভরা জীবন তুলে এনেছেন। সেখানে একটি গান রয়েছে: ‘আমার জীবন হইল ভবের বাড়ি/ দুঃখ নামের দিলা গাড়ি/ জংশনে জংশনে গাড়ি থেমে থেমে যায়।’

গানটি রাহেলার খুব পছন্দ! যখন মন খারাপ থাকে তখন গুনগুন করে গান আর ভাবেন- একদিন ঠিকই তিনি ফোর হুইলের গাড়ি চালাবেন। তিন চাকা হবে চার চাকা। জংশনে জংশনে গাড়ি আর থেমে থেমে চলবে না।

আলোকচিত্র: আগুয়ান

** ‘নারীর প্রতি সহিসংতা বন্ধে কাজ করছে সরকার’
** ‘নারীরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে’
** নারী পরিচালক হিসেবে আমি কোণঠাসা: নার্গিস আক্তার
** ‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY