সুন্দরবনে ‘প্র্যাকটিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়’

0
26

সুন্দরবনের পাশের উপজেলা শ্যামনগরের জেবুরনেছা পেশায় ছিলেন বনজীবী। বন থেকে গাছ কেটে কাঠ সংগ্রহ করাই ছিল তার কাজ। এভাবে চলতে থাকলে একদিন পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন উজাড় হয়ে যাবে। সুন্দরবন রক্ষায় কী করা যায়? এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে বন সুরক্ষিত থাকে এবং বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়। এমন ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসে সাতক্ষীরার স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জোয়ার।

জোয়ার ২০১৪ সালে বনজীবী জেবুরনেছার বাড়িতে পাঁচ শতাংশ জায়গায় ইকো ট্যুরিজমের অংশ হিসেবে দুটি ঘর করে দেয়। সেখানে সুন্দরবন দেখতে আসা দর্শনার্থীদের থাকার জন্য প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হয়। জেবুরনেছা গাছ কাটার কাজ ছেড়ে দেন। তিনি গাইড হয়ে দর্শনার্থীদের সুন্দরবন ঘুরে দেখানোর কাজ নেন। এখন এভাবেই জীবিকা নির্বাহ করছেন জেবুরনেছা। প্রতি মাসে গড়ে আয় তার ১৫ হাজার টাকা। শুধু জেবুরনেছা নন, জোয়ারের সহযোগিতায় ইকো ট্যুরিজমের মাধ্যমে এখন অনেকেই সেখানে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

জোয়ার-এর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রহমান আকাশ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘সুন্দরবনের যে গাছ কেটে বনজীবীরা জীবিকা নির্বাহ করতো, পর্যটন গাইড হয়ে পর্যটককে সে গাছ দেখিয়ে তারা এখন আয় করে। দর্শনার্থীদের রাতে থাকার ব্যবস্থা করে। তাদের সেবা দিয়ে বিনিময়ে কিছু আয় করে। এতে সুন্দরবনও সুরক্ষিত হচ্ছে, বনজীবীদেরও বিকল্প কর্মসংস্থান হচ্ছে।’

ইউল্যাবের একদল শিক্ষার্থী সম্প্রতি বেড়াতে গিয়েছিল সুন্দরবনে। তারা রাত্রী যাপন করে শ্যামনগর মুন্সিগঞ্জের জোয়ার ইকো রিসোর্টে। সেই দলেরই একজন জুবায়ের আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘শহরের ইট পাথরের মধ্যে থেকে বড় হয়েছি। কখনো এমন প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশে থাকা হয়নি। এখানে না আসলে হয়তো জানাই হতো না, প্রকৃতির মধ্য থাকার মজা কতটা!’

দেশে ইকো ট্যুরিজম প্রসারে জোয়ার-এর মাধম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন আবদুর রহমান আকাশ। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ইকো কটেজ ইকো গাইড নিসর্গ নেটওয়ার্কের জাতীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ইকো ট্যুরিজম প্রসারে ভূমিকা রাখায় ২০১৩ সালে ইকো ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড পান আকাশ।

ইকো ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করা জোয়ারের শুরুর গল্প প্রসঙ্গে আকাশ জানান, ২০০০ সালে তিনি যখন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে এইচএসসিতে পড়তেন, তখন মাত্র আট টাকা পুঁজি নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু করেন। পরে সংগঠনের সাথে আরো অনেকে যুক্ত হন। সংগঠনটি সমাজসেবা থেকে নিবন্ধন পায় ২০০৭ সালে। জোয়ার দ্বারা সরাসরি পরিচালিত তিনটি ইকো ট্যুরিজম সেন্টারে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে ৮০ জন তরুণের। বর্তমানে সংগঠনটির আর্থিক সম্পত্তি রয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকার। রয়েছে একটি লঞ্চ ও পাঁচটি ট্রলার, যেগুলো দর্শনার্থীদের সুন্দরবন ভ্রমণে সাহায্য করে। এছাড়া সাড়ে তিনশ কিলোমিটার রাস্তায় সংস্থাটির রয়েছে সামাজিক বনায়ন।

চলতি বছর সংস্থাটি সুন্দরবনের পাশে ৫০ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছে ‘প্র্যাকটিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে বিশেষ ইকো ট্যুরিজম পার্ক। আকাশ বলেন, ‘মানুষ প্র্যাকটিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে বিশ্বের সব কিছু সম্পর্কে জানতে পারবে। এখানে সাগর- মহাসাগর, দেশ-মহাদেশ সবই থাকবে। প্রতিটি দেশের নামে থাকবে আলাদা আলাদা কটেজ। থাকবে পৃথিবীর ইতিহাস। এখানে এসে মানুষ সুন্দরবনের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে আরো ঘনিষ্ঠভাবে। এবং এভাবে তারা রাত্রীযাপন করতে পারবে পছন্দের দেশে।’

জোয়ার-এর ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে আকাশ জানান, সুন্দরবনসহ পুরো উপকূলের পরিবেশ সুরক্ষা ও ইকো ট্যুরিজম প্রসারে কাজ করবে জোয়ার। কম খরচে সুন্দরবনের প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশে কেউ থাকতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন এই নম্বরে: ০১৭৪২২৮৯৭৩২।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY