শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা!

0
484

ঢাকা : একুশের প্রথম পর্বে রচিত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অমর কবিতা ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। সে কবে রচিত, এ কবিতার একটি লাইনে বলা হয়েছে-‘শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’। ভাষা আন্দোলনের ৬৪ বছর পেরিয়ে এখনো চলছে সেই ভাষার মাস এবং কবিতার ওই লাইন অনুযায়ী আজও শিশু হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়েছে রাজধানীতে।

কারণ, চলতি মাসের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৭ দিনেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে অন্তত ১৪ শিশু। গত মাসে এই সংখ্যা ছিল ২৯। আর গত দেড় মাসে হত্যা করা হয়েছে ৪৫ শিশুকে। দেশে একের পর এক এই শিশু হত্যার ঘটনা অতীতের যে কোনো সময়কে হার মানিয়েছে। প্রতিদিনই গড়ে একটি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে।

যদিও এরইমধ্যে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার চার শিশু হত্যা মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন বাচ্চু মিয়া র‍্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এবং এর আগে কেরানীগঞ্জের আলোচিত শিশু আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত মোতাহারও একইভাবে নিহত হয়। এমন কি গত বছরের আলোচিত দুই ঘটনা সিলেটের শিশু রাজন ও খুলনায় রাকিব হত্যা মামলায়, দ্রুতবিচার শেষে আদালত খুনিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।

এসব দৃষ্টান্তের পরও যেন কমছে না এই শিশু হত্যা প্রবণতা। কিন্তু কেন? অবরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা টার্গেট হওয়ার কারণ হলো শিশুদের সাধারণত প্রতিরোধ করার সক্ষমতা থাকে না। তাই অপরাধীরা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিশুদের টার্গেট করে থাকে। এছাড়া যে কোনো শিশুই তার বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজনের কাছে অতিপ্রিয় বিবেচিত হয়। মূলত মানুষের বেশি পরিমাণে লোভ-ক্ষোভ, জায়গা জমি নিয়ে শত্রুতাসহ বিভিন্ন জেরে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে। কারণ, শিশুদের জিম্মি করতে পারলে খুব সহজেই তাদের স্বার্থসিদ্ধ করতে পারে অপরাধীরা।

শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিশুদের প্রতি নৃশংসতা বন্ধ ও শিশু হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন। সংগঠনের ঢাকা মহানগরী আমির মোস্তফা বশীরুল হাসানের সভাপতিত্বে এই মানবন্ধনে বলা হয়, সমগ্র দেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার যে তান্ডব শুরু হয়েছে দেশবাসী তা থেকে নাজাত চায়। দেশে অব্যাহত খুন, গুম, নির্যাতন ও দূর্নীতির কোন সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় নিষ্পাপ শিশু হত্যার মত অভিশাপ নেমে এসেছে। মানুষ হত্যার বিচার কুরআনী আইন অনুযায়ী দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলেই সমাজ ও রাষ্ট্র এই জাহেলিয়াত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

এছাড়া, শিশু নির্যাতনের জন্য দ্রুতবিচার আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি হত্যা ও সন্ত্রাস রোধে ধর্র্মীয় চেতনাকে শিক্ষার সর্বস্তরে সিলেবাসভুক্ত করা হলেই এমন ঘটনা কমে যাবে বলে দাবি এই ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নেতাদের।

শিশু হত্যার মত অপরাধ দূর করতে হলে দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে শিশু নিরাপত্তা, নারী নিরাপত্তাসহ যেকোনো ধরনের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করা অসম্ভব বলে মনে করছেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, নিখোঁজ বা অপহরণের পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে, মামলা হয়েছে। এমন কি মুক্তিপণ চাওয়ার বিষয়টিও পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারপরও ওই শিশুদের জীবিত উদ্ধার করা যায়নি।

এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেছেন, ‘শিশুদের টার্গেট করা নতুন একটা ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। সহজেই টার্গেট করা যায় বলে দুর্বৃত্তরা শিশুদের টার্গেট করছে। তবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী শিশু হত্যা বা অপহরণ সম্পর্কিত ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য সচেষ্ট রয়েছে।’

পাশাপাশি শিশুরা যেন কোনো ধরনের টার্গেটে পরিণত না হয় সেজন্য সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। যে কোনো ধরনের অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন, পুলিশের এই অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক।

২০১২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শিশু হত্যার হার ছিল ক্রমবর্ধমান। ২০১৫ সালে এই হার ২০১৪ সালের তুলনায় কিছুটা কমেছিল। কিন্তু চলতি বছরে প্রায় প্রতিদিনই শিশু হত্যার ঘটনা আগের সব হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে।

শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এক হাজার ৮৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৬৬ জন এবং ২০১৫ সালে ২৯২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অপহরণের পর ১১১ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। আর ২০১২ সালে ৬৭ শিশু অপহরণে শিকার হয়, এদের মধ্যে ১৭ জনকে উদ্ধার করা হলেও ৫০ জনের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই এই সংস্থাটির কাছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY