বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগ তিন থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ: টিআইবি

0
96

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক নিয়োগের প্রতিটি ধাপেই হচ্ছে দুর্নীতি। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়ে থাকে।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক নিয়োগ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।

রোববার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

‘সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন সংগঠনটির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার দিপু রায় ও মো. রেযাউল করিম।

এতে দাবি করা হয়, প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকে প্রাধান্য না দিয়ে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় দলীয় পরিচয়, স্বজনপ্রীতি এবং অঞ্চলপ্রীতি।

রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকদের ‘দলভারী’ বা ভোটবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কিংবা স্বজনপ্রীতি ও অঞ্চলপ্রীতি থেকে এসকল অনিয়মে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী শিক্ষক, ছাত্রনেতা, স্থানীয় নেতা, ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান।

এর বাইরেও প্রভাষক নিয়োগে সর্বনিম্ন ৩ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্রবেশদ্বার হিসেবে শুধু প্রভাষক নিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রভাষক নিয়োগ সম্পর্কিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, প্রভাষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধাপ, নিয়োগ কমিটির গঠন কাঠামো, সদস্য নির্বাচন বা অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া, নিয়োগ কর্তৃপক্ষ ও অংশীজনের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গবেষণায় মোট ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ আটটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দুটি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি দুটি এবং একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে অনুষ্ঠিত প্রভাষক নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

গবেষণায় প্রভাষক নিয়োগে দুর্নীতির অন্যতম কারণ হিসেবে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা না থাকা, নিয়োগের চাহিদা তৈরি ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকা, সিন্ডিকেট কর্তৃক ইচ্ছামাফিক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ ও নিয়োগ কমিটি গঠনের সুযোগ, প্রভাষক নিয়োগে ভিসি ও প্রো-ভিসির ভূমিকা, পরীক্ষার ফলাফল যাচাই ও অভিযোগ দায়েরের সুযোগ না থাকা নিয়োগে এই অস্বচ্ছতা কারণ।

এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগের অনিয়মটি অনেক ক্ষেত্রেই একাডেমিক পড়াশোনার সময় থেকে শুরু হয়। শিক্ষক কর্তৃক পছন্দের শিক্ষার্থীর একাডেমিক ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রভাবিত করা ও পরবর্তীতে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করার দৃষ্টান্ত গবেষণায় পাওয়া যায়।

গবেষণায় দাবি করা হয়, শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার বিনিময়ে আগে থেকে একাডেমিক পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা দেয়া, ক্ষেত্র বিশেষে নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নম্বর বাড়িয়ে দেয়া, পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বলে দেয়া এবং পরবর্তীতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ঘটনা প্রভাষক নিয়োগের আগেই ঘটে থাকে।

অন্যদিকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ ঠেকাতে অপছন্দের শিক্ষার্থীকে একাডেমিক পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেয়ার উদাহরণও বিদ্যমান রয়েছে বলে গবেষণায় দেখা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী প্রার্থীদের নিয়োগ ঠেকাতে কিংবা প্রভাবশালী শিক্ষকদের আধিপত্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে অব্যাহত রাখতে শিক্ষক নিয়োগের চাহিদা না দেয়া বা প্রলম্বিত করার তথ্য পাওয়া যায়।

আবার নিয়োগের চাহিদা অনুমোদনের ক্ষেত্রে একাডেমিক কাউন্সিল সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই ভোট বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অনুসারী তৈরির জন্য যে কোনো চাহিদা অনুমোদন দেয় বলেও তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয় গবেষণায়।

এতে আরও বলা হয়, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থী বা প্রার্থীদের নিয়োগের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কর্তৃক সুবিধা অনুযায়ী প্রার্থিতার যোগ্যতা পরিবর্তন, যেমন- গ্রেডিং হ্রাস-বৃদ্ধি কিংবা ‘নির্দষ্টি বিষয়ে যোগ্যতা বা থিসিস থাকতে হবে’ ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে দাব করা হয়, ভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী প্রার্থীদের অ্যাকাডেমিক ফলাফলের যোগ্যতা পূরণ করলেও মৌখিক পরীক্ষার জন্য তালিকাভুক্ত না হওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গেছে।

বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত নিয়োগের সুপারিশ করা হয় উল্লেখ করে গবেষণায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪টি বিভাগের জন্য প্রকাশিত ১৪টি বিজ্ঞপ্তিতে মোট ৪৪ জনের নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ৯২ জন প্রভাষক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে যা দ্বিগুণেরও বেশি। অতিসম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজনের বিপরীতে নয়জন শিক্ষক নেয়ার তথ্য রয়েছে।

এ ধরনের অনিয়ম রোধে গবেষণায় বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। এর কয়েকটি হলো- শিক্ষক নিয়োগে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রণয়ন, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শিক্ষক সমিতির প্রভাবমুক্ত রাখা, ভিসি ও প্রো-ভিসি নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন, শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম সীমিতকরণ এবং ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধকরণ।
এছাড়া, শিক্ষকদের কর্মভার বিবেচনা করে শিক্ষক নিয়োগের চাহিদা যাচাই ও উপস্থাপন, প্রভাষক পদে আবেদন করার যোগ্যতা বা নিয়ম পূর্ব থেকে সুনির্দিষ্ট করা, নিয়োগ কমিটি গঠনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং নিয়োগ-বিধি লংঘনের কার্যকর জবাবদিহিতা ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতের সুপারিশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতার আলোকে টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনের ফলকে ‘বাস্তব’ আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষকও যদি নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন, তাহলে তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ান।’
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে প্রভাষক নিয়োগের সার্বিক চিত্রকে ‘হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক’ আখ্যায়িত করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় রাজনৈতিক বিভাজন এখন দেশের শিক্ষকদের মধ্যকার দ্বিধা-বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
টিআইবি নির্বাহী বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রভাবশালী একাংশের সমঝোতার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে নানা ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, টিআইবি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY