ধর্মঘটে অচল দেশ

0
14

বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ এবং ঘাতক চালকের ফাঁসিসহ ৯ দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন বন্ধের পাঁয়তারা চলছে। এর অংশ হিসেবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা হঠাৎ করেই অঘোষিত ধর্মঘট ডেকে বাস-ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই গত শুক্রবার থেকে রাজধানীতে মালিক-শ্রমিকরা বাস চালানো প্রায় বন্ধ করে দেয়। এতে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় বাস আসাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সারা দেশ অচল হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে অসংখ্য মানুষ।

দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ যাতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে সে কারণেই মালিক শ্রমিকরা অঘোষিতভাবে পরিবহন ধর্মঘট করছে বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সড়ক আইনের সাজা কমাতে সেই পুরনো কৌশলই বেছে নেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত বলে তারা মনে করেন।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একদিকে যেমন গাড়ি চালাননি, অপরদিকে তারা গাড়ি চলাচলে বাধাও দিয়েছেন। রাজধানীর সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকরাই সড়কে নেমে চলাচলে বাধা দেন। এমনকি বাস থেকে যাত্রীদের রাস্তায় নামিয়ে দেন।

শুক্রবার বিকালে এক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য মহাখালী বাস টার্মিনালে যান নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। সেখানে তিনি আশার কথা বলেন, ‘আজকে যে পরিস্থিতি দেখলাম, কাল যদি সেই পরিস্থিতি থাকে তাহলে আশা করি কাল থেকে মালিক শ্রমিকরা গাড়ি চালাবে। আমাকে বিভিন্ন মালিক এবং শ্রমিক কমিটির নেতারা যেটা জানিয়েছে, আজ রাতের গাড়িগুলো তারা চালাবে এবং কাল পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে পরিস্থিতি বুঝে গাড়ি চলবে।’

ধর্মঘট নয়, নিরাপত্তার অভাবে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে দাবি করে নৌমন্ত্রী বলেন, ‘চালকদের বিভিন্ন জায়গায় মারধর করা হচ্ছে। সে কারণেই মালিক এবং শ্রমিকরা গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন।’

অঘোষিত ধর্মঘটের ব্যাপারে ঢাকা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘সড়কে আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। এ পর্যন্ত চার শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। সে জন্যই রাস্তায় যানবাহন নামছে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যখন সড়কে নিরাপদ বোধ করব তখন থেকে গাড়ি নামাব। এটা আমাদের আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি নয়।’ এ সময় তিনি নতুন আইনকে স্বাগত জানাবেন বলে জানান।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত কয়েকদিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় বাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া আগামী সোমবার সড়ক পরিবহন আইন অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে। খসড়া ওই আইনে বিভিন্ন অপরাধের সাজা নিয়ে ঘোর আপত্তি রয়েছে তাদের। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনও তারা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না। তাই সড়কে নিরাপত্তা নেই এ অজুহাত দেখাচ্ছেন তারা। নিরাপত্তা ফিরে না আসা পর্যন্ত গণপরিবহন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা।

এদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অঘোষিত এ পরিবহন ধর্মঘটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাসের অভাবে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। বিদেশগামী ও হজযাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের আমদানি-রফতানি পণ্য আটকে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শাকসবজি ও কাঁচা পণ্য নষ্ট হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা।

গাড়ি বন্ধ করে দাবি আদায়ে মালিক-শ্রমিকদের কৌশল এবারই নতুন নয় বলে মনে করেন গণপরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক। তিনি বলেন, গাড়ি বন্ধ করে অতীতে দাবি আদায় বা প্রেসার সৃষ্টি করা মালিক ও শ্রমিকদের পুরনো কৌশল। এবারও তারা একই কৌশল প্রয়োগ করছেন। এর মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছে। এটা বড় অন্যায় ও প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সামনে নির্বাচন। তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। দেশব্যপী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সরকারের সামনে পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এসেছিল। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, লাইসেন্স ও রুট পারমিট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোনো গাড়ি যেন না চলে। কিন্তু প্রশাসন এ আন্দোলনকে সুযোগ হিসেবে না নিয়ে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। আগামীতে আবারও সড়কে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য বুমেরাং হতে পারে।

সরেজমিন দেখা গেছে, শুক্রবার রাজধানীর সড়কে বেসরকারি বাস নেই। মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে লাইন দিয়ে বাস রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা, মিরপুর, আমিনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি রেখে দেয়া হয়েছে।

এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো একেবারেই ফাঁকা ছিল। রাস্তায় মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার এবং সিএনজি চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। ফার্মগেট, মিরপুর, মহাখালী, পল্টনসহ প্রতিটি বাস স্টপেজে শত শত মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করেছেন।

এদিকে হঠাৎ করেই ধর্মঘট ডেকে জনদুর্ভোগ ও বিশৃঙ্খল সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ।

জানা গেছে, পরিবহন ধর্মঘট এবারই নতুন নয়, এর আগেও বিভিন্ন দাবিতে অঘোষিত ধর্মঘট পালন করেছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় বাসচালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাভারে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় এক ট্রাকচালকের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে অঘোষিত ধর্মঘট পালন করেন তারা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বাসায় এক বৈঠকের পর ওই ধর্মঘট হয়েছিল। একই বছর সিটিং সার্ভিস বন্ধের অভিযানের বিরুদ্ধে ঢাকায় ধর্মঘট পালন করেছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। ওই ধর্মঘটের পর সরকার সিটিং সার্ভিসের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজিব ও দিয়া খানম মিম নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় ১৫ জন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না, তা পরীক্ষা করে।

বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। এরপর শুক্রবার আন্দোলনকারীরা সেভাবে রাস্তায় নামেনি। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে সংকট সৃষ্টি করেই চলেছেন।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তুম আলী খান বলেন, নিরাপত্তার কারণে সব গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গাড়ি বন্ধ রাখার বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত দেইনি। প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY