জিয়ার খুনির বিচার এড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা দিলেন খালেদা

0
257

আত্মজীবনীমূলক বই লিখেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বইটি লিখতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে তার। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় উপলক্ষে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। ৮৮০ পৃষ্ঠার এ বইয়ে শৈশব, কৈশোর, সামরিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম, বিয়ে, পারিবারিক অনেক কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বগুণ ও তার জনপ্রিয়তার আকর্ষণীয় বর্ণনা। হাজার টাকা মূল্যের এ বইটিতে জিয়াউর রহমান হত্যায় জেনারেল আবুল মঞ্জুরের সম্পৃক্ততা এবং সঙ্কটময় ওই সময়ে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে তার ভূমিকার সব ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। এছাড়া বইয়ে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে বিচারপতি শাহাবউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকাও। ওই সরকার ব্যবস্থার ব্যাপক সমালোচনাও করেছেন সাবেক এ প্রেসিডেন্ট। বইটিতে লেখকের বক্তব্যের বিভিন্ন দিক ধারাবহিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে ।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘোষিত হত্যাকারী ছিলেন জেনারেল আবুল মঞ্জুর। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করলেন না। জিয়া হত্যার চৌদ্দ বছর ৯ মাস পর তার স্বীকৃত খুনি জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার দায় চাপানো হলো আমার ওপর। মঞ্জুর হত্যায় মামলা দেয়া হলো আমার বিরুদ্ধে। উদ্দেশ্য ছিল আমাকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করে দেয়া।

এ বিষয়ে আমি ইতোপূর্বে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। এখানে তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। তবে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনুল হক জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলা দ্রুত সম্পন্ন করতে আদাজল খেয়ে লেগেছিলেন। মঞ্জুর হত্যা মামলায় আমার জামিন আবেদনের শুনানিতে অংশ নিয়ে সাবেক আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী বলেন, ‘হত্যার কথিত তারিখ হচ্ছে ১৯৮১ সালের ১ জুন। আর এজাহার দাখিল হয়েছে ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এই চৌদ্দ বছর বিলম্বের জন্য যে কারণ দেখানো হয়েছে, তা নট এ কজ অ্যাট অল। হত্যা মামলার এজাহার দেওয়ার সময় পোস্টমর্টেম রির্পোট কিংবা ডেথ সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না। এটা তদন্তে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তার প্রয়োজন, বাদীর নয়। সে কারণেই চৌদ্দ বছর পর দায়েরকৃত এ মঞ্জুর হত্যা মামলা কোনো মামলাই নয়।’
অ্যাডভোকেট রাব্বী বলেন, ‘মামলার এজাহারে এরশাদ বা অন্য কারো নাম নেই। এসব নাম পরবর্তীতে চার্জশিটে ঢোকানো হয়েছে। এই চার্জশিটের ভিত্তি কী? সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল লতিফের ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত একটি স্বীকারোক্তি। এই স্বীকারোক্তি হুমকি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং অমানবিক দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে পুলিশ সংগ্রহ করেছে। এটা স্বেচ্ছায় প্রদান করা হয়নি। জেনারেল লতিফ প্রথম সুযোগেই আদালতে একথা বলেছেন। ফলে স্বীকারোক্তির বিষয়বস্তু নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং আইনের চোখে এই স্বীকারোক্তির সামান্য মূল্যও নেই।’

অ্যাডভোকেট রাব্বী আরও বলেন, ‘তাহলে কী দাঁড়ায়? চৌদ্দ বছর নয় মাস পর যে এজাহার দেয়া হলো তাতে এরশাদের নাম ছিল না। পরে তাকে হয়রানি ও রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই এই বানোয়াট ও সাজানো মামলা দায়ের করা হয়। যেখানে মামলারই কোনো ভিত্তি নেই, সেখানে আসামী কেনো জেলে থাকবে?’

এ প্রসঙ্গে আমি আরও দুজন অভিযুক্ত আসামির নিয়োজিত আইনজীবীর বক্তব্য না তুলে ধরে পারছি না। মঞ্জুর হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল লতিফের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘আমার ক্লায়েন্ট জেনারেল লতিফের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি ঘটনাস্থলের আশেপাশেও ছিলেন না, ছিলেন অনেক দূরে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। খাগড়াছড়ির কমান্ডার ছিলেন।… গ্রেপ্তারের পর জেনারেল লতিফের সঙ্গে তিন-চার মাস কাউকে দেখা করতেও দেয়া হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ওই সময়ে তার ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়, তার ফলে তার নর্মাল সেন্স কাজ করছিল না। অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, তিন-চার মাস পর তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আত্মীয়-স্বজনকে চিনতে পর্যন্ত পারতেন না।’…

মঞ্জুর হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মেজর (অব.) এমদাদের পক্ষে জামিন আবেদনের শুনানিতে তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শরফুদ্দিন আহমদ মুকুল বলেন, ‘রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে কাউকে নিগৃহীত করার জন্য এদেশে অনেক কিছুই করা হয়। আদালতের কাছে আমার বক্তব্য এই যে, বিচার হওয়া উচিত কিন্তু  সে বিচার যেন প্রহসনের না হয়। যখনই কোনো বিচার হবে, সেখানে একটি অপরাধ থাকতে হবে। আমার প্রশ্ন, অপরাধ কোথায়? কী নিয়ে হৈ চৈ? মঞ্জুর নিহত হয়েছেন। তিনি তার নিজের সৃষ্ট ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়নি, তিনি নিহত হয়েছেন। তিনি বেঁচে থাকলে ফাঁসিতে ঝুলতেন। হি ভায়োলেটেড দি ল অব দ্য ল্যাণ্ড। হি ওয়ানটেড পাওয়ার, সো হি ডায়েড।

… অ্যাডভোকেট শরফুদ্দিন মুকুল বলেন, ‘ওই সময়ে দেশে একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার চট্টগ্রাম বিদ্রোহের নায়ক মঞ্জুরকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন। ওই ঘোষণা বারবার বেতার ও টেলিভিশন থেকে প্রচার করা হয়। সরকারের সেই আদেশ বা ঘোষণা তো প্রত্যাহার করা হয়নি। সে আদেশ বলবৎ থাকলে মঞ্জুরের মৃত্যু হত্যা হয় কী করে? এটা সবাই জানেন, কোনো অভ্যুত্থান সফল হলে তার সকল কর্মকাণ্ড বৈধ হয়। আর অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে তার উদ্যোক্তারাই মারা যান। দে কান্ট গেট প্রটেকশন।’

অ্যাডভোকেট মুকুল আরও বলেন, ‘এটা দুঃখজনক যে, বিগত সরকারের প্রধান স্বামীর হত্যাকারীর বিরুদ্ধে আইনগত অবস্থান না নিয়ে হত্যাকারীর নিহত হওয়ার বিষয়টিকে মূলধন করে এরশাদকে হয়রানি ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এ মামলা দায়ের করান। নরহত্যা মামলায় কাউকে জড়ানো তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার একটা প্রধান উপায়। এই লক্ষ্যে এরশাদের বিরুদ্ধে এ সাজানো মামলা দায়ের করা হয়।

অ্যাডভোকেট মুকুল আরও বলেন, ‘মামলার  এজাহার দানকারী মঞ্জুরের ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুর একজন প্রখ্যাত আইনজীবী। ভাইয়ের মৃত্যুর পর মামলা দায়ের করার জন্য তিনি চৌদ্দ বছর অপেক্ষা করলেন কেন? এর কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তিনি দেননি। আদতে তিনি ছিলেন সাবেক  বিএনপি সরকারের হাতের একজন ক্রীড়নক। ওই সরকারের লক্ষ্য ছিল এরশাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট ও অবৈধ মিথ্যা কাহিনি রচনা ও রটনা করা, চট্টগ্রাম বিদ্রোহ সম্পর্কে আর্মির ও বিচার বিভাগের তদন্তকে ধামাচাপা দেয়া। সবচেয়ে বড় কথা, তারা চেয়েছিল যে, এরশাদ যেন আর জেল থেকে বের না হতে পারেন। জেলে আটক থাকলে তার মনোবল ভেঙে যাবে এবং তিনি যেন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো  আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারেন।…

দুদিন ধরে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির পর ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আমার জামিন মঞ্জুর করেন।

একটি নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন ওই এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। একজন সংসদ সদস্যকে যদি তার অধিকার পূরণ করে সংসদে বসতে না দেয়া হয়, তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় ওই এলাকার জনগণকে প্রতিনিধিত্বহীন করে রাখা, ওই এলাকার সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করা, যা মূলত অগণতান্ত্রিক আচরণ। আমি আমার নিজ এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলাম। সংসদে আমার সদস্যপদও বহাল ছিল। আমাকে আটকে রেখে সংসদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়ার কারণে আমার এলাকার জনগণের পক্ষে কথা বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য অভিযুক্ত হলেও তাকে সংসদে বসতে দেয়ার নজির আমাদের দেশে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতেও রয়েছে। আমার বিষয়ে স্পেশাল ট্রাইবুনালের বিচারে দায়েরকৃত দুটি মামলার একটিতে ১০ বছর, আরেকটিতে ৩ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হলো। সেসব মামলার হাইকোর্টে আপিল করা হয়। এতদসত্ত্বেও আইন মন্ত্রণালয় আমার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের নোটিশ দিল, যা কোনোভাবেই আইনসম্মত ছিল না।

নিম্ন আদালতের কোনো মামলার আপিল যখন উচ্চতর আদালত গ্রহণ করেন, তখন নিম্ন আদালতের সাজা আর বহাল থাকে না, এটাই জানি। কিন্তু নিম্ন আদালতের কনভিকশনের জের ধরে আমাকে সংসদে বসতে দেয়া হলো না। প্যারোলে কয়েক ঘণ্টার জন্য মুক্তি নিয়ে শপথ গ্রহণ করাতে পারলে আমাকে প্যারোলে সংসদ অধিবেশনেও যোগদান করতে দেয়া যেতো। কিন্তু আমাকে আমার ন্যায়সঙ্গত ও আইনানুগ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY