কেনাকাটার ১৪ কোটির ৯ কোটি টাকাই লুটপাট!

0
16

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের আলোচিত পর্দা দুর্নীতি, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনাকাটার প্রস্তাবে অস্বাভাবিক অনিয়মের পর এবার হবিগঞ্জে নব প্রতিষ্ঠিত শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কলেজে ৪২ হাজার টাকার ল্যাপটপ কেনা হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা দরে। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কালার প্রিন্ট প্রতিটি ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও কেনা হয়েছে সাত হাজার ৮০০ টাকা করে। এভাবে কলেজটির অধ্যক্ষ ডা. আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে কলেজের প্রায় ১৪ কোটি টাকার টেন্ডারের বিপরীতে অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে বরাদ্দের প্রায় ৯ কোটি টাকা লুট করার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দুই বছর ধরে তিনি স্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ি বিনা টেন্ডারে ভাড়া দেখিয়ে মাসে ৭০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করেছেন।

২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ শহরের নিউফিল্ড মাঠে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হবিগঞ্জে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন, যা পরে তাঁর নামেই নামকরণ হয়। পরে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি ৫০ জন শিক্ষার্থীর ক্লাস শুরুর মাধ্যমে শুরু হয় এর শিক্ষা কার্যক্রম। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর বছরেই বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। অধ্যক্ষ ডা. আবু সুফিয়ান ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টাকার টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারা করেন। সরকারপ্রধানের নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে শুরুতেই এমন লুটপাট মানতে পারছে না স্থানীয় মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলেজটির ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বইপত্র, সাময়িকী, যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৮ সালের সূচনাতে। পরে গত বছরের ১৭ মে প্রয়োজনীয় পণ্যের শিডিউল জমা পড়ে। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে যাঁদের রাখা হয়েছিল, কাজের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদনে তাঁদের কোনো সই-ই ছিল না। টেন্ডারে আহ্বান করা হয় মূলত ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার। এর মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর খাতে সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয় এক কোটি ৬১ লাখ টাকা ৯৭ হাজার টাকা। আর ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা মালামাল ক্রয় বাবদ ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে ওই মালামালের মূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি নয়—এমনটিই বলছে টেন্ডারপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।

সূত্র মতে, দরপত্রে মোট সাতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত দরদাতা (রেসপনসিভ) হিসেবে গ্রহণ করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। এতে বইপত্র ও সাময়িকী, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ, সার্জিক্যাল রিকোয়্যারমেন্ট ইত্যাদি পণ্যের দর আহ্বান করা হয়। সূত্র মতে, সরবরাহ করা মালামালের মধ্যে ৬৭টি লিনেভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০ কোর আই ফাইভ, কিং জেনারেশন) দাম নেওয়া হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটির দাম পড়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকার কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ফ্লোরায় একই মডেলের ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকার এইচপি কালার প্রিন্টারের (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডাব্লিউ) দাম নেওয়া হয়েছে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ টাকা। ৫০ জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। যেসব চেয়ার কেনা হয়েছে, তা হাতিলের মতো ফার্নিচার ব্র্যান্ডের চেয়ারের দামের চেয়েও দ্বিগুণ বেশি।

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিকের মডেলের দাম এক কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা নিয়েছে। দেশের বাজারে ‘পেডিয়াট্রিক সার্জারি’ (২ ভলিউমের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা। নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫৫০ টাকা। রাজধানীর মতিঝিলের মঞ্জুরি ভবনের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তিন লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করেছে; যার দাম নিয়েছে দুই কোটি ৬৩ লাখ ৩২৫ টাকা। বাজারে এর দাম এক লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। পুনম ইন্টারন্যাশনাল একই কম্পানি ও মডেলের এসির দাম এক লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির দাম নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। একইভাবে ফ্রিজ ও টিভি কেনা হয়েছে দু-তিন গুণ বেশি দামে।

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবিসংবলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে সাত হাজার ৮০০ টাকা দরে। এ রকম ৪৫০টি চার্ট ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে কলেজ অধ্যক্ষ তাঁর স্ত্রীর নামের একটি গাড়ি নিজে ব্যবহারের জন্য কোটেশন দিয়ে ৭০ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। তবে বর্তমানে সরকার থেকে একটি গাড়ি বরাদ্দ পেয়েছেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ডা. মর্জিনা বেগম। কিন্তু কোটেশনে দেখানো হয় শুধু মর্জিনা বেগম। আড়াই বছর এভাবে নেওয়া হয় বিল। এসব বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবু সুফিয়ানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কয়েক দফায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই কল হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এ ছাড়া গতকাল সোমবার একাধিকবার ক্যাম্পাসে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। সূত্র কালেরকণ্ঠ

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY