প্রতি লিটারে উড়োজাহাজ কতদূরে যায়?

0
51
plane

১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর। আমেরিকার বাসিন্দা তারা দুই ভাই। অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট। বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়েছিলেন তারা দুজন। মানুষের সফলভাবে আকাশে উড়ার যাত্রা শুরু।

আকাশ জয়ের এই গল্প অনেকেরই জানা। দুই রাইট ভাইয়ের হাত ধরে আধুনিক উড়োজাহাজের দেখা পেয়েছে পৃথিবীবাসী। তারপর প্রযুক্তির উৎকর্ষে বহু আধুনিকায়ন হয়েছে আকাশ যোগাযোগে।

গতি, নিরাপত্তা ও নকশায় এসেছে পরিবর্তন। এ পথে হাঁটতে গিয়ে বহু চ্যালেঞ্জ এসেছে নকশাবিদদের সামনে। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় সমস্যার সমাধান মিলেছে। এখন আকাশপথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন বেড়েছে।

গাড়িতে বা বাইকে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে দরকার হয় ডিজেল অথবা পেট্রোল। কিন্তু উড়োজাহাজে ভরা হয়ে থাকে এভিএশন ফুয়েল, জেট ফুয়েল, এভিএশন গ্যাসলাইন, বাইও ফুয়েল এসব ভিন্ন ধরনের জ্বালানি। উড়োজাহাজটিতে কোন ধরনের ইঞ্জিন লাগানো আছে এবং এটি কেমন এল্টিটিউডে ফ্লাই করে থাকে, তার ওপর নির্ভর করে কোন জ্বালানি দেওয়া হবে।

বোয়িং-৭৪৭ এর কথাই বলি। এখানে কেরোসিন তেল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যার ফ্রিজিং পয়েন্ট হয়ে থাকে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি থেকে মাইনাস ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। আর এ কারণে এটি হাই এল্টিটিউটে জমে না। বোয়িং-৭৪৭ অথবা ৭৭৭ এর কথা যদি বলি, তবে এটি প্রতি এক সেকেন্ডে চার লিটার তেল পোড়ে। এর জন্য প্রতি এক সেকেন্ডে চার লিটার ফুয়েল খরচ হয়।

উড়োজাহাজটির এক কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে ১২ লিটার তেলের প্রয়োজন হবে। এর একটি বড় সুবিধা হচ্ছে, একসঙ্গে ৪৬৫ জন যাত্রী নিয়ে ট্র্যাভেল করতে পারে। যদি আমরা প্রতিজন যাত্রীর ফুয়েল কঞ্জাংশন বের করে থাকি, তবে একজন যাত্রীর জন্য এক কিলোমিটার যেতে শুন্য দশমিক শুন্য চার লিটার তেলের প্রয়োজন হবে। যদি ফ্লাইট দশ ঘণ্টার হয়ে থাকে, তবে উড়োজাহাজটির এক লাখ ৫০ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন হবে।

আপনারা হয়তো টিভিতে দেখে থাকবেন যে, একটি উড়োজাহাজ যখন রানওয়েতে দাঁড়ানো থাকে, তখন একটি ছোট গাড়ির সঙ্গে তার সংযুক্ত থাকে। বেশিরভাগ মানুষই ভাবেন যে, উড়োজাহাজে ফুয়েল ভরা হয় এই গাড়ি দিয়ে। কিন্তু আসলে তা নয়। একে বলা হয় এজিপিইউ বা ওকজিলারি গ্রাউন পাওয়ার ইউনিট। এই সিস্টেমটি উড়োজাহাজে বিদ্যুৎ প্রবাহ করে। কারণ যখন উড়োজাহাজ রানওয়েতে থাকে তখন এর দুইটি ইঞ্জিনই বন্ধ থাকে; যার কারণে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বিদ্যুৎ জেনারেট করতে পারে না। এর জন্য এটাকে বাইরের বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হয়, যাকে আমরা এজিপিইউ নামে জানি।

উড়োজাহাজের তেলের ট্যাঙ্কটি সাধারণত এর পাখার সঙ্গে থাকে, যা ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা। কিন্তু বিভক্ত করার পরেও এই ট্যাঙ্কগুলো এত বড় থাকে যে চার থেকে পাঁচজন মানুষ আরামে ঘুমাতে পারবে। আর সবগুলো ট্যাঙ্ক একটি আরেকটির সঙ্গে কিছু ফাঁকা স্থানের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে, যাতে উড়োজাহাজের দুইটি পাখাতেই ফুয়েলের মাত্রা সমান আকারে থাকে। যদি একটি ট্যাঙ্ক খালি হয়ে যায়, তবে আরেকটি ট্যাঙ্ক থেকে নিজেই নিজেই উড়োজাহাজের প্রধান ট্যাঙ্কে চলে যায়, যার জন্য প্লেনের সব স্থানে ওজন ঠিক থাকে।

সরাসরি ট্যাঙ্ক থেকে ফুয়েলের পরিবহন শুধু জেট ইঞ্জিনে থাকে। যেটি ঠিক জেট উড়োজাহাজের পাখার নিচে থাকে। কিছু প্লেনের ইঞ্জিন পাখার ওপরেও থাকে। এমন কন্ডিশনে এক ধরনের মোটর ব্যবহার করা হয়। যা তেলকে ট্যাঙ্ক থেকে ইঞ্জিন পর্যন্ত নিয়ে যায়।

জেট ফুয়েল তেজগতিতে আগুনও ধরতে পারে। তাই একটি ছোট-খাটো শটসার্কিটও ফুয়েল ট্যাঙ্কির খুব সহজে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। আর তেলের ট্যাঙ্ক যদি কোনও কারণে আগুনও ধরে যায় তবে আগুন শুধু উড়োজাহাজের পাখায় থাকবে আর যাত্রীরা কিছুটা হলেও আগুন থেকে নিরাপদ থাকবে। এছাড়াও আরেকটা মেকানিজম হয়ে থাকে উড়োজাহাজের পাখায়, যার সাহায্যে পাইলট ইমারজেন্সি তেলগুলোকে বাইরে হাওয়ার মতো বের করে দিতে পারে, যাতে ফুয়েল ট্যাঙ্ক খালি হয়ে যায়। আর উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায়।

এমনই একটি ঘটনা ইউএস এয়ার ওয়েজের সঙ্গে হয়েছিল, যা রানওয়ে থেকে ওড়ার কিছুক্ষণ পরই এর পাখায় এক ঝাঁক পাখি উড়ে আসে, আর এতে আগুন ধরে যায়। সেইবার যাত্রীরা বেঁচে গিয়েছিল এই উপায়ে।

প্রসঙ্গত, আগামী দিনের আকাশে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সাশ্রয়ী বিমানের রাজত্ব তৈরি করতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা। সোলার চালিত বিমানের উন্নয়ন নিয়ে কাজ চলছে বছরের পর বছর ধরে। সেই ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে বড় সাফল্যের দেখা মিলল। প্র্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিল সৌরচালিত বিমান। বিশ্বের প্রথম সৌরচালিত বিমান সোলার ইমপালস হাওয়াই থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়ার অংশ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেয়। তিন দিনের ফ্লাইট শেষ করে বিমানটি ক্যালিফোর্নিয়ায় অবতরণ করে। জাপান থেকে একটি ফ্লাইট শুরুর পর বিমানের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়। পরে আট মাস ধরে সংস্কার কাজের জন্য উড্ডয়ন বিরতির পর বিমানটি হাওয়াই থেকে উড্ডয়ন করে। ক্যালিফোর্নিয়ায় অবতরণের জন্য বিমানটি স্যান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেইট ব্রিজের উপর দিয়ে উড়ে যায়। বিশ্ব ভ্রমণের অংশ হিসেবে এটি বিমানটির নবম ফ্লাইট।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY