তবু যুদ্ধ হয়!

0
9

কেউ চায় না, তবু যুদ্ধ হয়। চাইলে তো কথাই নেই। কথায় কথায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধ অতীতে হয়েছে। বর্তমানে হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। পৃথিবী ও সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসের পরতে পরতে যুদ্ধ নামক ঘটনাটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মিশে আছে।
সুপ্রাচীনকালের মহাভারতের যুদ্ধ, মহাকাব্য শাহনামা’য় সোহরাব-রুস্তমের যুদ্ধ, গ্রিক দেশের ট্রয়ের যুদ্ধের মতো আধুনিক জগতের মানুষ দেখেছে দু’টি মহাযুদ্ধ, পারমাণবিক যুদ্ধ, যুদ্ধাবস্থার উত্তেজনায় ঠাসাঠাসি ‘কোল্ড ওয়্যার’ বা স্নায়ুযুদ্ধ।

আর এখন দেখছে ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা’ আর ‘চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ’। এমনকি, বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালের অতি সঙ্কুল পরিস্থিতিতেও থেমে নেই যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধাবস্থা। ফলে যুদ্ধের বিবরণ ছাড়া পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের ইতিহাস রচনা করাই অসম্ভব।
দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে যুদ্ধের চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় ভারতেরই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের কন্যা, ইতিহাসের অধ্যা পিকা ড. উপিন্দর সিংয়ের গবেষণালব্ধ গ্রন্থ ‘পলিটিক্যাংল ভায়োলেন্স ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া’-এ। ভারতের বৈরী-প্রতিবেশী, যার সঙ্গে একাধিক যুদ্ধ ছাড়াও প্রায়ই বিরাজ করে যুদ্ধাবস্থা, সেই চীনের ইতিহাসও অসংখ্য যুদ্ধের ঘটনায় রক্তাক্ত। চীনে সুন জ়ু রচিত ‘আর্ট অফ ওয়ার’ বইটি যুগ যুগ ধরে শুধু জনপ্রিয়ই নয়, যুদ্ধের ইতিহাসে ঋদ্ধ।
যুদ্ধ বিষয়ক বিশ্বখ্যাত, অনন্য গ্রন্থ, ঊনবিংশ শতাব্দীতে জেনারেল কার্ল ভন ক্লাউসউইটজ-এর লেখা ‘অন ওয়ার’। প্রুশিয়ার অধিবাসী কার্ল ভন বিখ্যাত ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়নের সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করেন ১৮১৬ থেকে ১৮৩০ সময়কালের মধ্যে। মৃত্যুর পর তার স্ত্রী বইটি প্রকাশ করেন। এই বইতে তিনি যুদ্ধের যে সংজ্ঞা দেন, তা আজও জনপ্রিয়, সর্বজন গৃহীত। তিনি বলেন, ‘ওয়ার ইজ দ্যফ কনটিনিউয়েশন অফ পলিটিক্স বাই আদার মিনস্ (যুদ্ধ হলো অন্য পথে রাজনীতি)।’ তিনি নিজে যোদ্ধা হয়েও এবং অনেকগুলো যুদ্ধ করার পরও অকপটে বলে গেছেন, ‘যুদ্ধ তখনই হয় যখন আলোচনার রাজনীতি ব্যরর্থ হয়।’ কিন্তু ‘আলোচনাই যে শ্রেষ্ঠ পথ’, তা তিনিও স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন তার রচিত গ্রন্থে।
‘শত্রুকে গভীরভাবে জানতে হবে’, চীনা যুদ্ধ-বিশারদ সুন জ়ু একথা বলেছিলেন এমন এক সময়, যখন চীন শতাব্দীর পর শতাব্দী নানা বহিরাগত লোলুপ আক্রমণকারীর হাতে রক্তাক্ত হচ্ছিল। চীনের প্রয়োজন ছিল মজবুত আত্মরক্ষা ব্যবস্থা। সেজন্যই চীনের সম্রাটরা শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষার জন্য নিষিদ্ধ নগরী গড়ে তোলেন, যা এখন নিষিদ্ধও নয়, নগরীও নয়, বরং জমজমাট পর্যটন ক্ষেত্র।
একদা অভিন্ন সমাজতন্ত্রের অনুসারী হলেও চীন আর রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ ও বৈরিতার ইতিহাসও কম নয়। রুশরা দীর্ঘদিন চীনের ওপর প্রভুত্ব করেছে। সাংহাইতে বেশিরভাগ পুরনো অট্টালিকা ও হোটেলে অদ্যাবধি রুশ স্থাপত্যে র নিদর্শন রয়েছে। আবার সেই চীনই ১৯৪৯ সালের পর ভিয়েতনামে আক্রমণ করেছে এবং কাম্বোডিয়াকে বিপদে ফেলেছে।
পশ্চিম দুনিয়ার সঙ্গে যখন সমাজতান্ত্রিক চীনের সম্পর্ক মধুর নয় এবং কার্যত কোনো দেশেই চীনা রাষ্ট্রদূত নেই, তখন ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীনে পাঠান পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে। তার আগে মার্কিন সাংবাদিক এডগার স্নো বেইজিং-এ গিয়ে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করেন।
কিসিঞ্জার তার ‘অন চায়না’ বইটিতে অনেক কথাই জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘সাধারণত যে কোনো দেশ তার স্থানীয় ভৌগোলিক অবস্থান বা নিজস্ব জাতির পরিচয়ে দেশের নামকরণ করে। অথচ চীন নিজেদের দেশের নাম দেয় ‘Zhongguo’, যার মানে ‘মিডল কিংডম’ বা ‘সেন্ট্রাল কান্ট্রি’। কিসিঞ্জার বলেন, ‘এই নামকরণ করার পেছনে মনস্তত্ত্ব হল, পৃথিবীর মধ্যেথ আমরাই হব সেরা, এমন মানসিকতা’। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়েছেন। তা হলো, ‘চীনকে সময় নিয়ে ধৈর্য্য ধরে বুঝতে হয়’। সম্ভবত এ কারণেই প্রথমবার যাওয়ার পর কিসিঞ্জার ৫০ বারেরও বেশি বার গিয়েছেন চীনে, যা বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে অন্যতম বিরল ঘটনা। চীনকে বুঝতে ও সামলে রাখতে মার্কিনিরা কখনোই কসুর করেনি। তারপরও নানা ইস্যুতে ও স্বার্থগত কারণে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক যুদ্ধংদেহী অবস্থান সম্পর্কে কে না জানে!
কূটনৈতিক চেষ্টা অব্যাহত থাকার পরেও বার বার যুদ্ধ বা যুদ্ধ-পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাও বিশ্ব ইতিহাসে দেখা গেছে। বিশেষত চীন ও ভারতের মধ্যে। ১৯৬২ থেকে চলতি ২০২০ পর্যন্ত চীন ও ভারতের সেনাবাহিনী একাধিকবার মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধে জড়িয়েছে কিংবা যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে থেকেছে, যার কিছু লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় প্রাক্তন ভারতীয় সেনা অফিসার প্রবাল দাশগুপ্তের ‘ওয়াটারশেড ১৯৬৭: ইন্ডিয়াস ফরগটেন ভিক্টরি ওভার চায়না’ নামক গ্রন্থে।
বৈশ্বিক মহামারির ভয়াল থাকায় যখন কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত, তখনো যুদ্ধ হচ্ছে, বাজছে যুদ্ধের দামামা, মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। এটা ঠিক যে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো, না চাইলেও আত্মরক্ষার তাগিদে বাধ্য হয়ে কখনো কখনো যুদ্ধের পথে যেতে হয়। কিংবা, চাপিয়ে দেয়ার ফলে বাধ্য হয়ে জড়িয়ে যেতে হয় যুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধের পটভূমি যা-ই হোক না কেন, তাতে নেতা ও কর্তাদের বিশেষ কিছু না হলেও, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আম জনতা। অকাতরে মরতে হয় অসংখ্য নিরপরাধ, সাধারণ মানুষকে। এটাই যুদ্ধের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY