জার্মানিতে করোনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম, কিন্তু কেন?

0
19

সংকটে ইউরোপ। মহাদেশটির বহু দেশ এখন লকডাউনে। সীমান্ত বন্ধ। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিপজ্জনকভাবে ভারাক্রান্ত। অর্থনীতি সঙ্কোচনের মুখে। মানুষ আতঙ্কজনক হারে মারা যাচ্ছে।
জার্মানিতে মোটাদাগে পরিস্থিতি একই। সম্পূর্ণ লকডাউনে না হলেও, স্কুল, দোকান, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। ২ জনের বেশি মানুষ সমবেত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।

অর্থনীতি সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়ার পথে। চাকরি হারাবে বহু মানুষ। এমনকি খোদ চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও স্ব-কোয়ারেন্টিনে চলে গেছেন যখন শুনেছেন যে তার ডাক্তারেরই করোনা হয়েছে। তবে পরীক্ষা থেকে জানা গেছে চ্যান্সেলরের হয়নি। এই মহামারীর সর্বনাশা গ্রাস থেকে জার্মানিও মুক্ত নয়।
তবে শুধুমাত্র একটি বিষয়ে জার্মানি ব্যতিক্রম: দেশটিতে এই রোগে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই মারা যাচ্ছে। করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৬ হাজারের কিছু বেশি। এদের মধ্যে মাত্র ৪০৩ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ মৃত্যুর হার ০.৭২ শতাংশ। বিপরীতে ইতালিতে মৃত্যুর হার ১০.৮ শতাংশ। সেখানে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। স্পেনে এই হার ৮ শতাংশ। বৃটেনে জার্মানির চেয়ে ৩ গুণ কম মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু মারা গেছে জার্মানির দ্বিগুণ।
জার্মানির এমন সাফল্যের রহস্য কী? এ এক ভীষণ কঠিন ধাঁধা। কেউ কেউ এই ব্যধির মন্ত্র নস্যাৎ করায় জার্মানির প্রশংসা করেছেন। তবে কেউ কেউ সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কী হচ্ছে জার্মানিতে? আমরা কী শিখতে পারি দেশটি থেকে?
প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হলো, প্রাথমিক অবস্থায় ও অবিরাম পরীক্ষা চালিয়ে গেলে উপকার পাওয়া যায়। মানুষকে ট্র্যাক করা গেলেও সুবিধা হয়। যেমন, দেশটির প্রথম রোগী পাওয়া যায় ২৮ জানুয়ারি। ভাবারিয়া অঙ্গরাজ্যের এক ব্যক্তি কাজ করেন একটি গাড়ি যন্ত্রাংশ কোম্পানিতে। ওই কোম্পানির আবার চীনের উহানে দু’টি কারখানা আছে। তার মধ্যেই প্রথম ভাইরাস থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। দুই দিনের মাথায় কর্তৃপক্ষ বের করে ফেলে যে কার মাধ্যমে ওই ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছেন। পাশাপাশি, ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা ছিলেন, তাদেরকে খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিনে নিয়ে যায়। ওই কোম্পানি থেকে আর কেউই চীনে যায়নি। ভাবারিয়ার কারখানাও বন্ধ হয়ে যায়। ওই কোম্পানির বেশ কয়েকজন কর্মীর শরীরে ভাইরাস পাওয়া যায়। তবে তখনই ভাইরাসের বিস্তার স্থগিত হয়ে যায়। সারাদেশে যেখানেই নতুন কেউ আক্রান্ত হয়েছে, সেখানেই এই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ একযোগে সনাক্ত, ট্র্যাক করা ও ঝুঁকির মুখে পড়া নাগরিকদের কোয়ারেন্টিনে নিতে কাজ করেছেন।
জার্মানি তাদের বৃদ্ধ বাসিন্দাদের সুরক্ষায়ও ভালো কাজ করেছে। বৃদ্ধ নাগরিকরা এই রোগের ঝুঁকিতে আছেন বেশি। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেই বৃদ্ধদের সঙ্গে দেখা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনেকে নিজ থেকেই কোয়ারেন্টিনে চলে গেছেন। নীতিনির্ধারকরা জরুরী ভিত্তিতে সতর্কতা জারি করে বলেছেন বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ সকলের কমিয়ে দেওয়া উচিৎ। এর ফলাফল হয়েছে অসাধারণ। দেশের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ হলো ৮০ বা তধুর্ধ্ব বয়সী মানুষ। কিন্তু আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ হলো এই বয়সী মানুষরা। যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যমা বয়স হলো ৪৬; অথচ, ইত্যালিতে ৬৩।
অন্য অনেকে দেশের চেয়ে জার্মানিতে তরুণদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এর আংশিক কারণ হলো দেশটি অনেক বেশি পরীক্ষা করেছে। তবে জার্মানি মৃতের সংখ্যার পাশাপাশি আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি কমাতে পারতো, যদি না সাংস্কৃতিক কিছু বিষয় না থাকতো। জার্মানি ঐতিহ্যগতভাবে স্কিং-প্রিয় জাতি। প্রতি বছর দেড় কোটি জার্মান স্কিং করতে বের হন। অস্ট্রিয়ান ও উত্তরাঞ্চলীয় ইতালিয়ান আল্পস পর্বতমালা তাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ বছর ছুটিতে বহু জার্মান উত্তর ইতালির টাইরলে গেছেন স্কিং করতে, যেই শহরটি কিনা এই রোগের অন্যতম ভারকেন্দ্র। এই পর্যটকরা দেশে ফেরার সময় ভাইরাস নিয়ে এসেছেন, ছড়িয়েও দিয়েছেন।
আরেকটি কারণ হলো কার্নিভাল। জার্মান তরুণদের মধ্যে কার্নিভাল খুবই প্রিয়। প্যারেড ও পার্টিতে বুঁদ হয়ে থাকে মানুষজন। ল্যাংব্রয়েচ শহরে এই কার্নিভালে যোগ দেওয়া এক জুটির কাছ থেকে শ’ শ’ মানুষের মাঝে এই রোগ ছড়িয়েছে। জার্মান পার্লামেন্ট সদস্য ও ডাক্তার কার্ল লটেরবাখ বলেন, ‘ প্রথম দিকে রোগীর সংখ্যা কম থাকলেও, স্কিং ও কার্নিভাল–উভয়ই এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।’
প্রাথমিক পর্যায়েই ব্যপকহারে তরুণদের পরীক্ষা করানোই জার্মানির এই নিম্ন মৃত্যুহারের অন্যতম কারণ। ফ্রাঙ্কফুর্টের করোনাভাইরাস পরীক্ষাগারের পরিচালক মার্টিন স্টার্মার বলেন, “মূল বিষয় হলো, আমরা কত বেশি ও কাকে কাকে পরীক্ষা করছি।” সাধারণ অর্থে বলতে গেলে, ইতালির মতো যেসব দেশ পরীক্ষা করে কম, এবং যারা খুব বেশি অসুস্থ তাদেরই কেবল পরীক্ষা করতে চায়, তাদের মধ্যে মৃত্যু হার বেশি।
তবে পরিসংখ্যানের ওপর বেশি নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে। জার্মানির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বেশ আধুনিক; যথেষ্ট কর্মী ও অর্থায়নও আছে। ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতেই প্রতি ১ লাখ রোগীর বিপরীতে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (আইসিইউ) সবচেয়ে বেশি। তাই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সংকটে পড়লে দেশটির পারফরম্যান্স কেমন হবে, তা এখনও জানা যায়নি। রোগীরা মাত্র হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করেছে। গড়ে একজন গুরুতর অসুস্থ কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী আক্রান্ত হওয়ার ৩০ দিন পর মারা যান। রবার্ট কোচ ইন্সটিটিউটের প্রেসিডেন্ট লোথার উইলার বলেন, ‘আমরা সবে এই মহামারীর প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। এই মহামারী কীভাবে সামনে আগাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।’
এমনটা হওয়া অসম্ভব নয় যে, জার্মানি স্রেফ পিছিয়ে আছে সময়ের তুলনায়। সময় হলে ঠিকই ভুগবে। আগামী সপ্তাহগুলোতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর কত কঠিন চাপ পড়বে তা নিয়ে মতভেদ আছে। বার্লিনের চ্যারাইট বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সামাজিক চিকিৎসা, রোগতত্ব ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের পরিচালক স্টিফান উইলিখ বলেন, ‘আমি মনে করি ইতালির মতো পরিস্থিতিতে পড়ার সম্ভাবনা আমাদের কম।’ তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা এত আশাবাদী নন। ড. লটেরবাখ যেমন সতর্ক করে বলেছেন যে, জার্মানির মৃত্যু হার বাড়তে পারে ভবিষ্যতে। গত কয়েকদিনেই কিন্তু মৃত্যু হার ০.৪৮ থেকে বেড়ে ০.৭২-এ এসে পৌঁছেছে।
এছাড়া কিছু লক্ষণও দেখা গেছে যে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শিগগিরই বিধ্বস্ত হয়ে পড়তে পারে। অনেক হাসপাতাল ও ডাক্তার ইতিমধ্যেই মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষামূলক উপকরণের অভাব থাকার কথা বলেছেন। বুধবার বেশ কয়েকটি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশ করা গবেষণাপত্রে পূর্বাভাষ দেওয়া হয়েছে যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সকল রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আইসিইউ থাকবে না জার্মানিতে। ফলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হয়তো ভবিষ্যতে আসতে পারে।
সুতরাং, জার্মানির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শুধু একটি শিক্ষাই নিতে পারি। তা হলো, উপরওয়ালার আশির্বাদ বা ডাটার ওপর তাড়াতাড়ি নির্ভর করা যাবে না।
(নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতামত কলাম।)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY