আইসিজের আদেশ এবং আন্তর্জাতিক আইন

0
65

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে আদেশ দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)। আদালত থেকে দাবি করা হয়েছে, মিয়ানমার যেন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা বন্ধে সক্রিয় হয়; দেশটির সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনীকে যেন গণহত্যা চালানো, ষড়যন্ত্র করা এবং গণহত্যায় উস্কানি দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়; আক্রান্ত এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রতি ৬ মাস পর পর এসব বিষয়ে আইসিজেকে জানানো হয়।

২৩ শে জানুয়ারি আইসিজের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি চলমান বিরোধের বিষয়ে নজির স্থাপন করেছে। এর পরিণাম হতে পারে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতায় আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যত প্রয়োগের একটি মাধ্যম। যে আইনগত ও মানবিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে জাতিসংঘ সনদ, মিয়ানমার পরিস্থিতিকে খর্ব করতে সেই আইনগত ও মানবিক বিষয়গুলোকে নিজেদের কাজে লাগাতে পারে চীন ও রাশিয়া। আন্তর্জাতিক আইনের সাবোটাজ থেকে চীন এবং রাশিয়াকে আটকে দিতে আন্তর্জাতিক আইনের চিঠি ইস্যু করতে পারে পশ্চিমারা।

আইসিজের রায়ের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এমন একটি নজির স্থাপন করা যাতে আইসিজে এবং আরো বর্ধিত আকারে জাতিসংঘের প্রায়োগিক অন্যান্য অংশের এই মামলায় বিচার করার এক্তিয়ার আছে। এটা কেবল আদালতে আইনি সাফল্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
একই সঙ্গে তা হয়েছে রাজনৈতিকভাবেও, যখন মিয়ানমারের বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচি অপ্রত্যাশিতভাবে স্বেচ্ছায় তার দেশের পক্ষে আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, তিনি সেটা করেছেন তার দেশের সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ নিয়ে। এই সেনাবাহিনীই মূলত এই গণহত্যার মামলায় প্রধান অভিযুক্ত। আদালতে উপস্থিত হয়ে সুচি স্বীকার করেছেন যে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘাতের সময় যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে। তবে  সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে রায় দিতে আদালত হয়ত কয়েক বছর সময় নেবে। কিন্তু সুচির আদালতে উপস্থিতিতে দৃশ্যত মনে হয়েছে, তিনি এটা মেনে নিয়েছেন যে, আইসিজের বিচার করার ক্ষমতা বা এক্তিয়ার আছে। মিয়ানমারের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে সেই ঝুঁকি এখনও আছে বলে সিদ্ধান্তে আসতে আদালতের সময় লেগেছে মাত্র দুই মাস।

অং সান সুচির ওপর তার দেশের সেনাবাহিনী আধিপত্যবাদী প্রশাসনযন্ত্র নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে। সেই সুচি দৃশ্যত জেনারেলদের আশ্বস্ত করতে পেরেছেন যে, তার দেশ আন্তর্জাতিক প্রচ- চাপে রয়েছে। তাই এ বিষয়ে তাদের শুধু আত্মপক্ষ সমর্থনের মধ্যে তাদের স্বার্থ নেই। মিয়ানমার শুধু চীনের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ থেকে অবরোধ আসার বড় একটি ঝুঁকি রয়েছে। তাই শাসকগোষ্ঠী হয়তো সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বীকার করেছে যে, তাদের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল, তবে তারা গণহত্যা এড়িয়ে চলেছে। এটা হলে দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতো।

চীন সম্ভবত মিয়ানমারকে সমঝোতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পশ্চিমাদের চাপের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারে না বেইজিং। বিশেষ করে যখন নিজেদের উইঘুর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণ চালানোর কারণে বেইজিং সমালোচিত হচ্ছে। মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীকে আদালতে নেয়ায় চীনের জন্য একটি বিষয়ক সহায়ক হয়েছে। তা হলো আন্তর্জাতিক বিষয়ে তাদের প্রভাব জোরালো করে দেখানো হয়েছে। উইঘুর সঙ্কট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

স্টেট কাউন্সেলর হিসেবে সুচি প্রকৃতপক্ষেই বিশ্বাস করতে পারেন যে, তার দেশ যথাযথভাবে কাজ করেছে। কিন্তু মূল বিষয়টি হলো শাসকগোষ্ঠী মনে করছেন, তারা যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে আইসিজে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবে। সেনা নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রশমিত করতে অধিক সময় ক্ষেপণ করে। এ সময়ে বেসামরিক সরকারকে এর দায় নিতে সুযোগ দেয়া হয়।
এর একটি ইতিবাচক দিক হলো, এতে বৈশ্বিক মানবাধিকার বড় অর্জন করেছে। প্রথমত, এই বিচার একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে পারে আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক শক্তি এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার অবস্থান।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো তা বাস্তবায়ন নিয়ে। আইন ও জাতিসংঘ সনদের বিষয় হিসেবে আইসিজের আদেশ বর্তায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওপর। এই আদেশের প্রাথমিক জবাব হিসেবে মিয়ানমার বলেছে, তারা এসব বাধ্যবাধকতা এরই মধ্যে পূরণ করেছে, যা ছিল প্রত্যাশিত। এ দাবির প্রথম পরীক্ষা হবে তখন, যখন পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম রিপোর্ট দেবে তারা। এখনই আইসিজের আদেশের বিষয়ে আর কোনো একশন নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নি নিরাপত্তা পরিষদ। এর কারণ, চীনের ভেটো দেয়া। তারাই এ বিষয়ে মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে। এটাও প্রত্যাশিত ছিল।

পরিস্থিতি প্রায় যুক্তিপূর্ণ অবস্থায়। এখন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মিয়ানমার আদালতের ওই আদেশ লঙ্ঘন না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত আদেশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে আরো সময় দেয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানানোর অধিকার আছে চীনের। কিন্তু প্রশ্নটি হচ্ছে, সামনের মাসগুলোতে যদি মিয়ানমার আদালতের ওই আদেশের সঙ্গে সংঘাতময় অবস্থায় আসে তখন কি হবে।
যদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাস এক্ষেত্রে কোনো নির্দেশিকা হয় তাহলে কিছুই হবে না। ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করার জন্য যখন প্রশ্ন আসে সামনে তখন যুক্তরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্যরা যেমন তাদেরকে রক্ষা করে, স্থায়ী পরিষদের সদস্য চীন ও রাশিয়া সম্ভবত একই কাজ করবে। তারা ভেটো দেবে।

কিন্তু এখন পরিস্থিতির আইনগত দিক ভিন্ন। এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্মিলিত ইচ্ছা নিয়ে অথবা তারা কোনো বিষয়ে একমত হতে পারেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হবে নিরাপত্তা পরিষদ কি আন্তর্জাতিক আইন ও সনদের অধীনে তার আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে কিনা। যেখানে বলা আছে, আইসিজের আদেশ তাদেরকে প্রয়োগ করতে হবে।
অন্য কথায় আইসিজের আদেশ প্রয়োগের বিষয়ে যদি চীন ও রাশিয়া ভেটো দেয়, তাহলে আইনগত ভিত্তি চ্যালেঞ্জে পড়বে। এতে আইসিজের অস্তিত্বকে খর্ব করা হবে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার বিষয়ক যেসব রায় তাকে উল্টো দেবে এসব ঘটনা।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক আইনের ধারণাকে একটি অনিশ্চিত অবস্থানে নিয়ে যাবে। বাদি পক্ষের অনুকূলে একটি রায় রয়েছে। আইসিজের রুলিং প্রয়োগ করতে আইনগতভাবে বাধ্য নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘ সনদ। যদি তা করা না হয় তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ এই আইন ও সনদ লঙ্ঘন করবে। অথচ তারাই সৃষ্টি করেছে এই আইন ও সনদ। সমস্ত সম্ভাবনা, মিয়ানমার কোনো এক সময়ে আইসিজের রুলিং লঙ্ঘন করবে। যখন তারা এটা করবে তখন কমপক্ষে চীন তাদের পক্ষ নেবে। আইসিজের আদেশ প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণে নিরাপত্তা পরিষদকে তখন বিরত রাখবে চীন।

যখন এই দুটি ঘটনাই ঘটবে তখন আমরা আমাদেরকে আকস্মিকভাবে অত্যন্ত ভিন্ন রকম এক আন্তর্জাতিক আইনগত পরিবেশের মধ্যে পড়ে যাবে। এমনকি আন্তর্জাতিক আইন থাকার বিষয়টিকেও অস্বীকার করার ভান ধরা হবে। আমরা বর্তমানে এমন একটি বিশ্বে বসবাস করছি যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া বাদে বেশির ভাগ রাষ্ট্রকে ন্যূনতম এমনটা জাহির করে যে, সেখানে আন্তর্জাতিক আইন আছে। দূরদর্শিতা হিসেবে অন্য রাষ্ট্র ও নিজেদের নাগরিকদের সঙ্গে তাদেরকে মিথষ্ক্রিয়া নিয়ে মধ্যস্থতা করতে হবে আইনগত দিক দিয়ে। যদি আইসিজের আদেশ প্রয়োগ করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আইনগতভাবে যে বাধ্যবাধকতা আছে, তাতে অক্ষমতা প্রকাশ করে তবে আইন প্রয়োগের বিষয়টি মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জে পড়বে। এমনটা হলে অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি এবং ছোট ছোট ‘এক্টর’দের মধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনে একটি বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে।

কোনোভাবেই এমন পরিণতি অপরিহার্য নয়। যদি এমন কোনো দৃশ্যপটের উদ্ভব ঘটে তবে তাতে ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে। ন্যূনতমপক্ষে চীন এবং অন্য অগণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী নিজেদেরকে শক্তিমান হিসেবে মনে করবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়। তাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আইসিজের এই আদেশ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছেছে। তাতে নিরাপত্তা পরিষদে চীন বা রাশিয়া তাদের ভেটো শক্তি যতই প্রয়োগ করুক না কেন।

(লেখক সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসিতে ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড মাইগ্রেশনের পরিচালক। এ ছাড়া তিনি রোহিঙ্গা লিগ্যাল ফেরামের আহ্বায়ক। তিনি লিখেছেন ‘দ্য রোহিঙ্গাস: ইনসাইড মিয়ানমারস হিডেন জেনোসাইড’ এবং ‘র‌্যাডিকেল অরিজিনস: হোয়াই উই আর লুজিং দ্য ব্যাটল এগেইনস্ট ইসলামিক এক্সট্রিমিজম’। তার এ লেখাটি সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি থেকে অনূদিত)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY