হাত পেতে নয়, পত্রিকা বিক্রি করে ভালোই আছেন ঝুমু রানী

0
23

সমাজে নারীরা অসহায় না, নিজে ইচ্ছা করলে করতে পারেন অনেক কিছু। বাঁচতে পারেন সম্মান নিয়ে। এমন একজন জীবন সংগ্রামী মানুষ হলেন রাজবাড়ীর পত্রিকা বিক্রেতা ঝুমু রানী দাস।

স্বামীর মৃত্যুর পর জীবন সংগ্রাম হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্বামী জীবন দাসের পেশা পত্রিকা বিক্রি। জীবিকার তাগিদ ও ছেলের ভবিষৎ গড়তে হয়ে যান গৃহবধূ থেকে পত্রিকা বিক্রেতা। শুরুতে অনেক অনেক কটূ কথা শোনালেও সকল বাঁধা-বিপত্তি উপক্ষো করে নিজের মতো করে এগিয়ে গেছেন।

প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। গাড়ি থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে দেন বাসা-বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্নস্থানে। আর বিকেল করেন পত্রিকার কালেকশন।

বিয়ের আগে বা পড়ে ঝুমু রানী চিনতেন না রাজবাড়ী শহর ও আশপাশ এলাকা। কিন্তু তার স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার ও ছেলের ভবিষৎ গড়তে স্বামীর পেশা (পত্রিকা) বিক্রিকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। তবে তিনি পারতেন না সাইকেল চালাতে। ফলে পাঁয়ে হেঁটে শহরের এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি, এ দোকান থেকে ও দোকানে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা দিতেন। প্রথমে পাঁয়ে হেঁটে পত্রিকা দিলেও বর্তমানে সাইকেল চালিয়ে করছেন পত্রিকা বিক্রি। এখন স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে তার সংসার।

Jhumu

ঝুমু রানী দাস পৌর শহরের রেল কলোনি এলাকার পত্রিকা বিক্রেতা জীবন দাসের স্ত্রী। তার নিজস্ব বলতে কিছু নেই। সরকারি জায়গায় ঘর তুলে করছেন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে কিডনি রোগ ধরা পড়ে তার স্বামী জীবন দাসের এবং ২০১৮ সালের ২৫ জুন তিনি মারা যান। এরপর যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে ঝুমুর। দিশেহারা হয়ে পড়েন ছেলের ভবিষৎ ও সংসার চালানো নিয়ে। একপর্যায়ে স্বামীর পেশা পত্রিকা বিক্রিকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং কাকডাকা ভোর থেকে আর দশজন পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেন সাইকেল নিয়ে পত্রিকা দিতে।

নারী পত্রিকা বিক্রেতা হিসেবে জেলায় তিনি একা। আগে পত্রিকা বিক্রেতা বলে অনেকেই তাকে কটু কথা শোনাত। তবে এসবে পাত্তা না দিয়ে আপন মহিমায় এগিয়ে চলেছেন ঝুমু রানী। এখন আর কেউ তার পেশা নিয়ে বাজে মন্তব্য করে না। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ভালোই আছেন।

ঝুমু রানী দাস বলেন, তার স্বামী অসুস্থ থাকাকালীন সময় থেকে তিনি হাসপাতাল ও সাংসারিক খরচ চালাতে পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন। প্রথমদিকে ছেলের সহযোগিতায় পত্রিকা বিক্রি করেন। তখন তিনি ভালোভাবে শহর চিনতেন না এবং পারতেন না সাইকেল চালাতে। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছেলের জন্য নাস্তা তৈরি করে পত্রিকা বিক্রির উদ্দেশ্যে বের হতেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পত্রিকা বিক্রি শেষে বাজার সদাই করে বাসায় ফিরে আসেন। দুপুরে রান্না ও খাওয়া-দাওয়া শেষে বিকেলে বের হন কালেকশনে। বর্তমানে তার ছেলেকে নিয়ে খেয়ে-পরে ভালোই আছেন। কারও কাছে হাত পাততে হয় না। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটাই- ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করা।

Jhumu

স্থানীয় পত্রিকা বিক্রেতারা বলেন, জীবন দাসের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ঝুমু দাস যেভাবে তার পত্রিকা বিক্রির পেশাকে নিজের পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তাদের (পুরুষ) মতো করেই পত্রিকা গাড়ি থেকে নামান এবং হকার ও অন্য এজেন্টদের মধ্যে বিলি করেন। আর শেষে নিজে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বা অফিসে পত্রিকা দিয়ে আসেন। নারী হিসেবে সমাজের কাছে তিনি একজন দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে বোঝা যায় নারীরা সবই পারে।

স্থানীয় সাংবাদিক এজাজ আহম্মেদ বলেন, ‘নারীকে শুধু নারী না, মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে এবং নারীরা ইচ্ছা করলে পুরুষের মতো স্বাবলম্বী হতে পারেন। এর প্রকৃত উদাহরণ হচ্ছে পত্রিকা বিক্রেতা ঝুমু রানী দাস। তার স্বামীর মৃত্যুর পর পত্রিকা ব্যবসার হাল ধরেন এবং নিজেই ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন। এতে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সব বাঁধাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছেন। সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের উচিত তাকে অনুপ্রেরণা দেয়ার।’

তিনি বলেন, নারীরা যে অসহায় না, ইচ্ছা করলেই কাজ করতে পারেন এবং সন্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত ঝুমু রানী দাস।

রাজবাড়ী মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপ-পরিচালক নূরে সফুরা ফেরদৌস বলেন, নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। ঝুমু রানী তাদের মধ্যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পত্রিকা বিক্রি করে সংসার পরিচালনা ও সন্তান মানুষ করছেন। আমি মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানাই। জীবন সংগ্রামে একজন সফল নারী ঝুমু রানী দাস।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY