অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ২০১৫ গবেষণায় অনন্যা স্বীকৃতি পেলেন সোনিয়া নিশাত আমিন

0
165

দেশের গবেষণা ও প্রবন্ধসাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২২’ পেলেন বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন।

৫ ডিসেম্বর ২০১৫, শনিবার সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির শংকরে অবস্থিত সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র ছায়ানট ভবনের অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর হাতে এই পুরস্কারের সম্মাননা পদক ও সম্মাননা অর্থ ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ও বিশেষ অতিথির আসনে ছিলেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।

অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বে আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী তামান্না ডেইজি এবং সঙ্গীত পরিবেশন করেন দেশের দুই জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী চন্দনা মজুমদার ও মেহরীন।

 

অনুষ্ঠানটি শুরু হয় জাতীয় সঙ্গীতের ভেতর দিয়ে। পুরস্কার প্রদান পর্বে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও গবেষক ড. সোনিয়া নিশাত আমিনকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, তাঁর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সনদ তুলে দেন সেলিনা হোসেন, পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন তাসমিমা হোসেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও গবেষক ড. সোনিয়া নিশাত আমিনকে নিয়ে বলেন অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ইতিহাসবিদ প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, আমি আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণি, পুরস্কৃত লেখক সোনিয়ার শিক্ষক। এই কারণে এটা আমার জন্যে বিরল সৌভাগ্য। পাক্ষিক অনন্যাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। গুণিমানুষের মূল্যায়ন করলে সমাজ এগিয়ে যায়। আর সেটি না করতে পারলে সমাজ অন্ধকারের দিকে চলে যায়। এ কারণে এই ধরনের পুরস্কারের গুরুত্ব অনেক।

ড. আমিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, এটি খুব সম্মানীয় পুরস্কার। অনেকে এই পুরস্কার পেতে চান, তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে। সোনিয়া এই পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার বটে। আমি তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই।

 

ড. আমিনের কাজ নিয়ে সেলিনা হোসেন বলেন, পুরুষনির্মিত ইতিহাসে নারীর ইতিহাস বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে। যদি ‘হিস্ট্রি সারভাইবাল অব ফাক্টস’ হয় তাহলে নারীর ইতিহাস ছাড়া সেটি সম্পূর্ণ হতে পারে না। সোনিয়া মননশীলতা ও সৃজনশীলতা এক করেছেন তাঁর গবেষণার কাজে। ‘বাঙালি মুসলিম নারীর আধুনিকায়ন’ শীর্ষক তাঁর যে গবেষণা গ্রন্থ, সেখানে সোনিয়া ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ দিয়ে নারীর বিবর্তনের ইতিহাস তুলে এনেছেন।

১৮৭৬ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে নারীর ইতিহাসের নানা দিক, নানা অনুষঙ্গ তুলে এনেছেন। ইতিবাচক পরিবর্তন কিভাবে ইতিহাস গ্রহণ করেছে, সেটি সোনিয়া তাঁর গবেষণার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। এশিয়াটিক সোস্যাইটি থেকে সোনিয়ার ঢাকার নগরজীবনে নারী শীর্ষক একটি সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। চারশো বছরে নারীর বিবর্তনমূলক ইতিহাস তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। বিচিত্র বিষয় নিয়ে এখানে ২১টি প্রবন্ধ আছে। সোনিয়া সম্পাদক হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিষয়বস্তু নির্বাচন থেকে শুরু করে লেখক নির্বাচনে তিনি তাঁর বিচক্ষণতার পরিচয় রেখেছেন। সোনিয়া এখানে বলেছেন, নারীর ইতিহাস একটি নতুন শাস্ত্র, তাঁর এই বলার স্বরটি আমার ভালো লেগেছে।

 

অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ড. আমিন তাঁর অভিব্যক্তি প্রদান করতে গিয়ে বলেন, আজ আমার ভেতর তিনটি অনুভূতির মিথস্ক্রিয়া ঘটছে- গর্ব, আনন্দ ও বিনয়। গর্ব-আনন্দ এই কারণে যে, দীর্ঘ ২৫ বছর আমার গবেষণা জীবনের একটা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেলাম। আর বিনয় এই জন্যে যে, যাঁরা এই পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের নামের পাশে নিজের নাম উচ্চারিত হওয়াটা সৌভাগ্যের। নিজে বরাবরই নিভৃতে কাজ করেছি। পুরস্কার পাওয়ার কথা ভাবনায় আসেনি। আমি কাজ করেছি, আমার দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবোধ থেকে। আমি দেখেছি, ইতিহাসে নারীর অর্জন, নারীর বিবর্তন নানাভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। কখনো সেটি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আমি সেই কারণে, নারীর বিবর্তনমূলক ইতিহাস নিয়ে কাজটি করেছি।

ড. আমিন আরো বলেন, সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারে নারীর প্রতি যে বৈষম্য কয়েক হাজার বছর ধরে বিদ্যমান। সমাজ নির্মাণে নারীর যে অর্ধেক ভূমিকা সেটি কৌশলে অদৃশ্য করে দেয়া হয়েছে। শুধু অদৃশ্যই না, ক্ষেত্রবিশেষ তা বিকৃত করে তোলা হয়েছে। জ্ঞাননির্মাণে নারীর অংশগ্রহণ না থাকলে সেটি যেমন আংশিক হবে, তেমন বিকৃতও হবে।

 

সভাপ্রধানের বক্তব্যে তাসমিমা হোসেন বলেন, আজ অনন্যার ২১তম সাহিত্যপুরস্কার দেয়া হল। প্রথম পেয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তিনি আজ উপস্থিত আছেন। আমাদের কার্যক্রম খুব ছোট পরিসরে হলেও, কাজটি গুরুত্ব দিয়ে করতে চেয়েছি। প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা পুরস্কার দেয়ার জন্যে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সোনিয়ার নামটি আসাতে আমি নিজে তার বইগুলো সংগ্রহ করে পড়েছি। আমি নিজে ঋদ্ধ হয়েছি। আমার মনে হয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মূল্যায়ন হওয়া দরকার।

আমরা নারীরা প্রতিনিয়ত নানাভাবে হোঁচট খাচ্ছি। কিন্তু সেটি তো কোনোভাবে কাংক্ষিত নয়। তাই কোনো না কোনোভাবে আমাদের বক্তব্য বা প্রতিবাদ নিয়ে দাঁড়াতে হয়। সোনিয়া দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে অভিনন্দন।

মূলপর্ব শেষ হলে দর্শক মাতিয়ে তোলেন দেশের দুই জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী চন্দনা মজুমদার ও মেহরীন। মেহরীন গেয়ে শোনান রবীন্দ্রসঙ্গীত। চন্দনা মজুমদার পরিবেশন করেন লালনসঙ্গীত।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY